কেমন ছিল মেদিনীপুর স্বাধীনতার পর

  মেদিনীপুর জেলার বিবরণ বাংলা একটি সম্পূর্ণ প্রদেশ ছিল । ১৫ই আগষ্ট ( বাংলা ২৯ শে শ্রাবণ ১৯৪৭) হইতে এই প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ নামে দুইটি প্রদেশে বিভক্ত হইয়াছে । মেদিনীপুর জেলা পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম জেলা । পূর্ববঙ্গ এখন পাকিস্তানের মধ্যে পড়িয়াছে ।


সীমা : — মেদিনীপুর জেলার উত্তরে বাঁকুড়া ও হুগলী  জেলা ; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ; পূর্বে হাওড়া জেলা , রূপনারায়ণ নদ ও হুগলী নদী ; পশ্চিমে ছােটনাগপুর বিভাগ ও উড়িষ্যা প্রদেশ ।  

 আয়তন ও লােকসংখ্যা  : — মেদিনীপুর জেলার আয়তন ৫ হাজার ২৭৪ বর্গ মাইল । ১৯৪৭তে এই জেলার লােক সংখ্যা প্রায় ৩৩ লক্ষ ছিল  । কোন লােক বা দেশ বড় হয় , উন্নত হয় শুধু চেহারা বা আয়তনের জোরে নয় , গুণের বলে । মেদিনীপুরের  লােকের মহৎ গুণাবলী এবং তাহার উৎপন্ন দ্রব্য ও প্রাকৃতিক সম্পদই তাহাকে আজ বিশ্ববিখ্যাত করিয়াছে ।

 নদনদী , ভূমি ও উৎপন্ন দ্রব্যাদি  : — মেদিনীপুর জেলার  উত্তর - পশ্চিমাংশের ভূমি উচ্চ ও কঙ্করময় এবং ধান্যাদি । শস্য উৎপাদনের বিশেষ উপযােগী নয় । এই অংশে ছােট  ছােট পাহাড় ও অনেক গভীর জঙ্গল আছে । এই জেলার দক্ষিণ - পূর্বাংশ নিম্ন ও সমতল এবং শস্য উৎপাদনের  বিশেষ উপযােগী । এই অংশে ধান , কলাই , নানাবিধ শাক - সবজি , পান , তামাক , আখ , পাট , নারিকেল প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে জন্মে । উত্তর - পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর শিমূল ভূলা , আমলকী , বহেড়া , হরিতকী প্রভৃতি জন্মে । এই অঞ্চলে বহু বিস্তৃত শাল জঙ্গল আছে । মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়া শিলাবতী ( শিলাই ) , কংসাবতী ( কাসাই ) , কালীঘাই , সুবর্ণরেখা প্রভৃতি নদী এবং পূর্ব পার্শ্ব দিয়া রূপনারায়ণ নদ প্রবাহিত । এই সব নদ - নদী ও বঙ্গোপসাগর হইতে বিবিধ প্রকারের প্রচুর মৎস্য পাওয়া যায় । নদ - নদী ছাড়া এই জেলায় মেদিনীপুর ক্যান্যাল , হিজলী  টাইড্যাল ক্যান্যাল ও উড়িষ্যা কোষ্ট ক্যান্যাল নামে তিনটি বিখ্যাত কাটাই খাল আছে । এইগুলির উপর দিয়া নৌকা চলাচলের সুবিধা হয় এবং বৃষ্টিপাতের অভাবে এই সকল খাল হইতে জলসেচন করিয়া চাষ - আবাদের সুব্যবস্থা করা যায় ।


জলবায়ু — মেদিনীপুর জেলার উত্তর পশ্চিমাংশের জলবায়ু ও দক্ষিণ পূর্বাংশের জলবায়ুর মধ্যে আকাশ - পাতাল তফাৎ । উত্তর - পশ্চিমাংশে ভূমি উচ্চ ও কঙ্করময় । সেজন্য  এই অঞ্চলে শীত ও গ্রীষ্ম উভয়ই খুব বেশী । এই অঞ্চলের  ঝাড়গ্রাম স্বাস্থ্যকর স্থান । দক্ষিণ - পূর্বাংশে ভূমি নিম্ন । এই অঞ্চলে শীত ও গ্রীষ্ম অপেক্ষাকৃত অল্প । এই অঞ্চলের  কাথির জলবায়ু খুব ভাল । এখানে দুধ ও মাছ যথে পরিমাণে পাওয়া যায় ।
 জীবজন্তু : — এই জেলার জঙ্গলে ব্যাঘ্র , ভল্লক ,  , হরিণ প্রভৃতি জন্তু এবং টিয়া , চন্দনা প্রভৃতি সুন্দর সুন্দর  পক্ষী পাওয়া যায় । শিল্প ও বাণিজ্য শিল্প ও বাণিজ্যের দিক দিয়া এই জেলা অনুন্নত নয় । প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত ( বর্তমান তমলুক ) একটি প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল । রেল - চলাচলের পূর্বে মেদিনীপুর সহরও একটি প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল । এখন গেঁওখালি , পাঁচখালি , হরিখালি , তেলােপাখিয়া , সােণাখালি , মঙ্গলমাড়ো প্রভৃতি কয়েকটি স্থান মাল - আমদানি - রপ্তানির জন্য বিখ্যাত হইয়াছে । এই জেলার অমসি , আনন্দপুর , চন্দ্রকোণা , রামজীবনপুর অঞ্চলে খুব সূক্ষ্ম সূতী কাপড় তাঁতে তৈয়ারী হয় এবং কলিকাতা অঞ্চলে চালান যায় । পাঁশকুড়া , ময়না , রাধামণি অঞ্চলেও প্রচুর তাঁতের কাপড় প্রস্তুত হয় । হরিদাসপুর অঞ্চলে জালি মশারী তৈয়ারী হয় । আনন্দপুর ও কেগিয়াড়ীতে তসর ও কেটিয়া চাদর - কাপড় তৈয়ারী হয় । খড়ার , রামজীবনপুর , চন্দনপুর , এগ্রা প্রভৃতি স্থান এখনও কাসা - পিতলের বাসন তৈয়ারীর জন্য বিখ্যাত । রঘুনাথবাড়ী ও সবঙ্গের সরু কাটির মাদুর ও মছলন্দ সুবিখ্যাত । ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে বাঁশ হইতে নানাবিধ সুন্দর  সুন্দর জিনিষ ( যেমন পাখা , ঝুড়ি ইত্যাদি ) তৈয়ারী হয় । যােতঘনশ্যাম শিং - এর চিরুণীর জন্য বিখ্যাত । সম্প্রতি ১৫ । ২০ বৎসরের মধ্যে এই জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষত রেল লাইনের ধারে অনেকগুলি চাউলের কল স্থাপিত হইয়াছে । 


যাতায়াত ব্যবস্থা : – বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে এই জেলার ভিতর দিয়া গিয়াছে । ইহার মধ্যে খড়গপুর ঐ রেল পথের প্রধান জংসন । এই জংসন হইতে চারিটি শাখা চারিদিকে গিয়াছে । একটি শাখা বালিচক , পাঁশকুড়া ও কোলাঘাট হইয়া কলিকাতা গিয়াছে ; একটি শাখা মেদিনীপুর , চন্দ্রকোণারােড হইয়া বাঁকুড়ার দিকে গিয়াছে ; একটি শাখা বেলদা ( কন্টাই রােড ) , দাঁতন হইয়া পুরীর দিকে গিয়াছে এবং আর একটী শাখা ঝাড়গ্রাম , গিধনী হইয়া ঘাটশিলা , টাটানগর ও নাগপুরের দিকে গিয়াছে । নদ - নদীগুলিতে ষ্টীমার ও নৌকা চলাচল করে । কলিকাতা হইতে ষ্টীমারে ও নৌকায় গেঁওখালি , পাঁচখালি মঙ্গলমাড়াে , সােণাখালি , তমলুক , কোলাঘাট , ঘাটাল প্রভৃতি স্থানে যাতায়াত করা যায় । এসব ছাড়া জেলার মধ্যে ১০ টি বড় বড় রাজপথ এবং অনেক গুলি বড় রাস্তা আছে । অনেকগুলি রাজপথ ও রাস্তার উপর দিয়া মােটর বাস চলে । রাজপথগুলির মধ্যে উড়িষ্যা ট্রাঙ্ক রােড , মেদিনীপুর হইতে বালেশ্বর , বােম্বাই রােড , মেদিনীপুর হইতে ধারাসােল , । রাণীগঞ্জ - মেদিনীপুর রােড রাণীগঞ্জ হইতে মেদিনীপুর , মেদিনীপুর - উলুবেড়িয়া রােড মেদিনীপুর হইতে হাওড়া জেলার  উলুবেড়িয়া , কাথি রােড কঁথি হইতে বেলদা , ঘাটাল রােড ঘাটাল হইতে কংসাবতী নদী , বর্ধমান রােড , মেদিনীপুর  হইতে তারাজুলি , গড়বেতা রােড , গড়বেতা হইতে গােয়ালতােড় , কাথি - তমলুক রােড কাথি হইতে তমলুক এবং পাঁশকুড়া রােড তমলুক হইতে পাঁশকুড়া পর্যন্ত গিয়াছে ।  


শিক্ষা:-   মেদিনীপুর জেলার শতকরা প্রায় ৩০ জন লােক শিক্ষিত । এই জেলার মেদিনীপুর , কঁথি ও মহিষাদলে । তিনটি মহাবিদ্যালয় ( কলেজ ) আছে । বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রামে আর একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপনের  চেষ্টা চলিতেছে । এই জেলায় উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০ , ইহাদের মধ্যে চারিটি কেবলমাত্র বালিকাদের জন্য ; মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ের সংখ্যা হইবে । ২০০ এর অধিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় চার হাজার । মুসলমান বালকদের পৃথকভাবে শিক্ষার জন্য ৭টি মাদ্রাসা আছে । এই জেলায় শতাধিক সংস্কৃত টোল আছে । প্রাথমিক শিক্ষকদিগের শিক্ষার জন্য ৫টি বিদ্যালয় আছে । বস্ত্র বয়ন শিক্ষা দেওয়ার জন্য ৬টি বয়ন বিদ্যালয় আছে । দেশপ্রাণ শাসমল মহাশয়ের নামের সহিত জড়িত “ বীরেন্দ্র নাথ জাতীয় বিদ্যালয় ” নামে কাথিতে একটি বিদ্যালয় আছে ।


ধর্ম ও ভাষা : – মেদিনীপুর হিন্দুপ্রধান জেলা । এখানে মুসলমানের সংখ্যা শতকরা ৫৬ জন মাত্র । খৃষ্টানের সংখ্যা | নগণ্য । বাংলাই এই জেলার একমাত্র প্রধান ভাষা । তবে উড়িষ্যা ও বিহারের পাশ্ববর্তী অঞ্চলের লােকেরা কিছু - কিছু  উড়িয়া ও হিন্দী শব্দ ব্যবহার করে । সাঁওতালগণ সাওতালী  ভাষা ব্যবহার করে । তাহাদের মধ্যেও আজকাল ইংরেজী ও বাংলা শিক্ষার প্রচলন হইয়াছে । 


রাজবংশ - মেদিনীপুর জেলার প্রাচীন রাজবংশ ও জমিদার বংশের মধ্যে নিম্নে কয়েকটির নাম দেওয়া হইল  :- তমলুক রাজবংশ , সুজামুঠা রাজবংশ , খণ্ডরুই রাজবংশ , বাসুদেবপুর রাজবংশ , কিশাের নগর রাজবংশ , মহিষাদল । রাজবংশ , ময়না রাজবংশ , নাড়াজোল রাজবংশ , ঝাড়গ্রাম । রাজবংশ , জাম্বনি রাজবংশ , চন্দ্রকোণা রাজবংশ , বগড়ী রাজবংশ , কাশীজোড়া রাজবংশ , নারায়ণগড় রাজবংশ , রামগড় রাজবংশ , লালগড় রাজবংশ , বেলেবেড়িয়া রাজবংশ , পাঁচেট গড়ের চৌধুরী বংশ , বনপাটনার সৎপতি বংশ , গােপীবল্লভ পুরের গােস্বামী বংশ , পলাশীর নন্দী বংশ , মেদিনীপুরের মল্লিক বংশ , জাড়ার রায় বংশ ইত্যাদি । ইহাদের পূর্ধ্ব গৌরব নাই । তবে অনেকের আর্থিক সঙ্গতি আছে । দ্রষ্টব্য স্থান মেদিনীপুর জেলায় প্রাচীন ও দ্রষ্টব্য স্থান অসংখ্য । তন্মধ্যে মাত্র কয়েকটি বিশিষ্ট স্থানের নাম  এখানে উল্লেখ করিতেছি ।


মেদিনীপুর :- জেলার প্রধান সহর । এখানে সেন্ট্রাল জেল , মল্লিক বংশের বাটী ও দেবালয় , নাড়াজোল রাজার গােপ প্রাসাদ , মারাঠা কেল্লা , হনুমানজীর মন্দির , জগন্নাথ মন্দির , বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দির , জোড়া মসজিদ , সাজাহানের  নিৰ্মিত অর্ধমসজিদ , জলের কল , এনিকাট , মহাবিছালয় ( কলেজ ) প্রভৃতি দ্রষ্টব্য । 
কর্ণগড় : — এখানে একটি ভগ্ন দুর্গা , দশের ও দেবী মহামায়ার মন্দির আছে ।  গােপগিরি :— মেদিনীপুর শহরের পশ্চিমে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত একটি ছোট পাহাড় । প্রবাদ আছে , এখানে মহাভারতে উল্লিখিত বিরাট রাজার দক্ষিণ গােগৃহ ছিল । 
 খড়গপুর :- বিরাট কারখানা দুষ্টব্য । 

সরঃশঙ্কা :- ইহা একটি বৃহৎ দীঘি । দাঁতনের ৩ মাইল পূর্বে অবস্থিত । ইহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫ হাজার ফুট । 


নাড়াজোল – রাজবাটী ও মন্দিরাদি  দ্রষ্টব্য। 
অমসি : - এই স্থান ফাথি মহকুমার অন্তর্গত । এখানে সিদ্ধপুরুষ পীর মকদুম সাহেবের একটি কবর আছে । 
হিজলি — হিজলির নবাব বংশের রাজধানী ও মসনদই - আলার সমাধি স্থান । 

বীরসিংহ:- দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এন্ম স্থান । এখানে একটি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ও বিদ্যিসাগরের স্মৃতিস্তম্ভ আছে । 


তমলুক : — এখানে বগী ভীমা দেবী মদির , রাজবাটী প্রভৃতি দ্রষ্টব্য । ইহা অন্যতম পীঠস্থান । মহিষাদল রাজবাটী ও রথের মেলা প্ৰষ্টব্য । 
ময়না : রাজ বাটী ও গড় দষ্টব্য । 

Shyamal Kumar Rong

আমি মনসুকা খবরের এডিটর। মনসুকা খবরে আপনি যেকোনো খবর, ভিডিও, তথ্য বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আপনার তথ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫৭৩২৫২৫

Previous Post Next Post
Mansuka Khabar

বিজ্ঞাপন

Mansuka Khabar