মনসুকা, ঘাটাল, ১৩ই জানুয়ারি: সময় এগিয়ে চলে, সমাজ বদলায়। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে, যারা সময়ের স্রোতের মধ্যেও নিজের আদর্শ ও দায়বদ্ধতাকে অটুট রেখে দেয়। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল ব্লকের মনসুকা গ্রামের ‘অরুণোদয় সংঘ’ ঠিক তেমনই এক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫২ সালে যার সূচনা হয়েছিল, সেই সংঘ আজ পঁচাত্তর বছরের গৌরবময় পথ অতিক্রম করে প্লাটিনাম জয়ন্তী উদযাপন করল নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে।
১২ই জানুয়ারি সকাল থেকেই মনসুকা গ্রামে ছিল উৎসবের আবহ। সকাল দশটার কিছু পরে সংঘের উদ্যোগে একটি প্রভাতফেরি বের হয়। শিশু-কিশোর থেকে প্রবীণ— সকল বয়সের মানুষের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি গ্রামের বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে। হাতে জাতীয় পতাকা ও সংঘের পতাকা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি গ্রামবাসীর মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার করে।
প্রভাতফেরির শেষে সংঘ প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা ও সংঘের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধার আবহ তৈরি হয়। উপস্থিত ছিলেন ঘাটাল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শ্যামলী সরদার, মনসুকা লক্ষ্মীনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার মুখার্জি-সহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অতিথিদের চন্দনের ফোঁটা ও উত্তরীয় দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়।
সংঘের ইতিহাস তুলে ধরে সম্পাদক অনুপ কুমার সামন্ত জানান, ১৯৫২ সালে রাধানাথ সামন্তের নেতৃত্বে কয়েকজন তরুণ সমাজের জন্য কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে এই সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। প্রথমদিকে মনসুকা এল.এন. হাইস্কুল ও শিবমন্দির সংলগ্ন একটি সাধারণ মাটির ঘর থেকেই সংঘের কাজ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগ আজ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
এই দীর্ঘ সময়ে অরুণোদয় সংঘের ভূমিকা কেবল উৎসব আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। খরার সময়ে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, বন্যার সময়ে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ, দুঃস্থদের পাশে দাঁড়ানো— এই সব কাজ নিয়মিতভাবেই করে এসেছে সংঘ। প্রতিবছর রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির, দরিদ্রদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ এবং মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তক প্রদান সংঘের নিয়মিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত।
গ্রামে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে সংঘের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লক্ষ্মীনারায়ণ পাঠাগার। যুবসমাজকে শরীরচর্চায় উৎসাহ দিতে তৈরি হয়েছে আধুনিক জিম। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা প্রচারও সংঘের সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগগুলির ফলে গ্রামে সামাজিক পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মনসুকার দুর্গাপূজার ইতিহাসেও অরুণোদয় সংঘের অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো গ্রামের সার্বজনীন দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল এই সংঘের হাত ধরেই। আজ সেই পূজা মনসুকার প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
প্লাটিনাম জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছে চার দলীয় নকআউট ফুটবল প্রতিযোগিতা। খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে দর্শকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য ও সঙ্গীতের পরিবেশনা উপভোগ করেন গ্রামবাসীরা। সাংস্কৃতিক পর্বের পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন উৎপল সাঁতরা।
পুরো আয়োজন পরিচালিত হয় উদযাপন কমিটির সভাপতি অভিরাম কর ও সম্পাদক সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে। সংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্লাটিনাম জয়ন্তী উপলক্ষে সংঘ প্রাঙ্গণে একটি স্মারক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে উদযাপনের সমাপ্তি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
গ্রামবাসীদের মতে, অরুণোদয় সংঘ আজ কেবল একটি ক্লাব নয়— এটি মনসুকার সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পঁচাত্তর বছরের এই পথচলা যেন প্রমাণ করে দেয়, নিষ্ঠা ও ধারাবাহিক সমাজসেবাই একটি প্রতিষ্ঠানকে মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করে।




