(সুবর্ণজয়ন্তী স্মরণিকার ১৯৯৫ থেকে সংগৃহীত)
কলম নিয়ে ভাবছি , কি লেখা যায় আর ঠিক কোনখান থেকে শুরু করা যায় । একরাশ সুখের মূহুর্তে মানুষ যেভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ে — উচ্ছ্বাসে , আবেগে আমার অবস্থাও ঠিক তাই ভনিত বা ভূমিকা লেখার মতাে ভাষা হয়তাে আমার নেই , সাধ্য নেই ব্যাকরণ মেনে সুন্দরভাবে সব কিছু তুলে ধরার দীপ্ত মানসিকতা তবু “ মন নাহি মানে । ” তাই মনসুকা লক্ষ্মীনারায়ণ হাই স্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের প্রাক্কালে , — স্কুল জীবনের খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলিকে স্মরণিকার পৃষ্ঠায় সাজাতে বড় ইচ্ছা করে । সাধ জাগে সেই দিনগুলির কথা বলতে , যে দিনগুলি ছিল সতত সুখের ও অভিমানের ।
শহরের স্কুলে আমার ছাত্রজীবন শুরু হলেও এই স্কুলের পঠন - পাঠনের পরিবেশের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিতে খুব বেশী সময় লাগেনি । কারণ এই মনসুকা গ্রামেই আমার বাড়ী । গণপতিবাবু প্রতিদিন আমার বাড়ীর পাশ দিয়েই স্কুলে আসেন । স্কুলে আসা যাওয়ার পথে তার ছায়াসঙ্গী ছিলাম । শুধু তাই নয় স্কুলের নতুন বিল্ডিং তৈরীর সময় ইট , মাটি , কাঠ ইত্যাদি বইবার জন্য তার স্নেহময় আহ্বানে সাড়া দিতে কোনদিন কুণ্ঠাবােধ করিনি । সংকোচ হবে না সেদিন ক্লাসরুমে পরেশবাবুর হাতে বেধড়ক মার খাওয়ার কথা উল্লেখ করতে । মার খেয়ে চোখের জল শুকনাে হওয়ার আগেই তিনি আমাকে তার বােডিং ঘরে ডেকে নিয়ে গেছেন । পরম আপনজনের মতাে পাশে বসিয়ে সযত্নে আখ খাইয়েছেন । নিমেষের মধ্যে অভিমান ভুলে গভীরভাবে অনুভব করেছি , - “ শাসন করা তারই সাজে , সােহাগ করে যে ” । অভিমানের প্রসঙ্গ যখন উঠলো তখন অসিতবাবুর কথা না বলে থাকতে পারিনা । চক পেন্সিল নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত । ক্লাস শেষে বেরিয়ে যাবার সময় অবশিষ্ট চক পেন্সিল চেয়ে আমার নিত্য অভ্যাস ছিল ।
সেদিন ক্লাস রুমের মধ্যে চক পেন্সিলকে কেন্দ্র করেই আমার কোন এক সহপাঠী বন্ধুর সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলে । ফলে কিছুটা রাগ বা বিরক্তিতে অসিতবাবু বলেন , “ সামান্য জিনিস নিয়ে তােদের যখন এত ঝগড়াঝাটি তখন আমি তােদের আর কোন ক্লাস করব না ” । আর ওদিকে কয়েকদিন বাদেই পরীক্ষা । গণিতে বিশেষ করে পদার্থবিদ্যায় নির্ঘাৎ গাড্ডু খেতে হবে । নিজেদের ভুল অবিলম্বে নিজেরাই মিটিয়ে নিয়ে স্যারের কাছে ধর্ণা দিতে ছুটলাম । মূহুর্তের মধ্যে মধুর হাসি হেসে বললেন , “ চল , এক্ষনি তােদের ক্লাস নেব ” । আমাদের যত ভুল বােঝাবুঝি , গণিতের জটিল অংকের সহজেই সমাধান করার মতাে মিটিয়ে দিতেন ।
সেদিন ক্লাস রুমের মধ্যে চক পেন্সিলকে কেন্দ্র করেই আমার কোন এক সহপাঠী বন্ধুর সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলে । ফলে কিছুটা রাগ বা বিরক্তিতে অসিতবাবু বলেন , “ সামান্য জিনিস নিয়ে তােদের যখন এত ঝগড়াঝাটি তখন আমি তােদের আর কোন ক্লাস করব না ” । আর ওদিকে কয়েকদিন বাদেই পরীক্ষা । গণিতে বিশেষ করে পদার্থবিদ্যায় নির্ঘাৎ গাড্ডু খেতে হবে । নিজেদের ভুল অবিলম্বে নিজেরাই মিটিয়ে নিয়ে স্যারের কাছে ধর্ণা দিতে ছুটলাম । মূহুর্তের মধ্যে মধুর হাসি হেসে বললেন , “ চল , এক্ষনি তােদের ক্লাস নেব ” । আমাদের যত ভুল বােঝাবুঝি , গণিতের জটিল অংকের সহজেই সমাধান করার মতাে মিটিয়ে দিতেন ।
বিকালে প্রতিদিন স্কুল মাঠে খেলতে আসতাম । যে সমস্ত শিক্ষক মহাশয় ( বিশেষতঃ দিলীপবাবু ) স্কুল বােডিং - এ থাকতেন তাদের সাথেই ফুটবল , ভলিবল , ক্রিকেট , ব্যাডমিন্টনের অনুশীলন করতাম । কী ভীষন ভাল লাগতাে !
মনে পড়ে শিক্ষক বনাম ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ । পান্নালাল বাবু খুব সুন্দর ব্যাক খেলতেন । মোটাসােটা শরীর নিয়ে পাহাড়ের প্রাচীর তৈরী করে প্রতিপক্ষ ছাত্রদের বেকায়দায় ফেলতেন । আর অমিয়বাবু ও দিলীপবাবু তাে নিজ নিজ জায়গায় এখনাে মাঠের সেরা । মালকোছা করে কাপড় এঁটে মাঠে নামতেন নিমাইবাবু , বিজয়বাবু প্রমুখ । অল্প সময়ের জন্য হলেও হেডস্যার ( স্বর্গীয় বঙ্কিমবাবু ) মাঠে নামতেন । এই ফুটবল খেলায় প্রভূত আনন্দ , উৎসাহ , উত্তেজনা থাকতো ।
স্কুলের প্রতি আমার টান বরাবরই ছিল , আজও আছে । বয়সে নবীন হলে ও স্কুলের পরিচালকমণ্ডলীতে স্বল্পকালের জন্য আমি ঠাই পেয়েছিলাম । সেই সুবাদে স্কুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সকল শিক্ষক মহাশয়দের যে সাহচর্য্য , সহযােগিতা , উপদেশ পেয়েছি তা আমার কর্মজীবনে চিরদিন পাথেয় হয়ে থাকবে ।
স্কুল জীবনের এহেন বিবিধ ঘটনাবলী স্মরণ করার মধ্যে অনাবিল আনন্দ অনুভব করা যায় । এর পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় বঙ্কিম বাবুর কথা মনে পড়লে , দুঃখে মনটা ভারী হয়ে ওঠে । আমাদের তিনি কত ভালবাসতেন । ঘটনার বিবরণে তা প্রকাশ না করলেও , কেবল আমার ক্ষেত্রেই নয় , স্কুলের তৎকালীন সমস্ত ছাত্র - ছাত্রীদের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন । সকল ছাত্র - ছাত্রীদের তিনি অতি সহজেই আপন করে নিতেন । মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্তও তিনি স্কুলের ও তাঁর প্রিয় ছাত্র - ছাত্রীদের খোঁজ খবর নিতে ভােলেননি
। স্কুলের পঞ্চাশবর্ষপূর্তি উৎসবের প্রাক মুহুর্তে বিনম্রভাবে তার আত্মার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করি । শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যাদের অক্লান্ত । পরিশ্রমে , তাগে , তিতিক্ষায় ও সুমহান আদর্শে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে মনসুকা লক্ষ্মীনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ভবন । প্রার্থনা জানাই , জ্ঞানে গরিমায় উত্তরােত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটুক আমাদের এই প্রিয় বিদ্যালয়ের ।
Tags
Literature