দর্পণে , - আমি একা । লেখক -শ্রীঅশোক কুমার মাইতি ( প্রাক্তন ছাত্র)

( সুবর্ণ জয়ন্তী  ১৯৯৫ স্মরণিকা থেকে সংগ্রহ)

সেদিন আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম , আমার পুরুষ্ট কালো - গোফের মাঝে একখানি ' পক্ককেশ ’ – স্বমহিমায় বিরাজ করছে । ওটাকে তুলে ফেলতে ইচ্ছে হলেও পারলাম না । এই ভেবে , “ থাক না , ক্ষতি কি ? ওতো পরিবর্তনেরই এক মিঠি সংকেত । যেমনি করে প্রথম গোফের নরম ছোয়ায় শিহরণ জাগিয়েছিলো , মনে , প্রাণে । পরিবর্তনের দোলায় আজও তাই । পার্থক্য শুধু দেখার , অনুভবের বিস্মরণের ।
মনসুকা স্কুলের পাশ দিয়ে আমার নিত্য যাতায়াত । শুধু যাতায়াত বললে ভুল হবে , হাতে গােনা কয়েকপা গেলেই আমার বাসস্থান । কাজেই বিস্মরণ কিংবা কষ্ট করে স্মৃতির পাতা উল্টানাের প্রয়ােজন নেই বললেই চলে । নিয়ম মাফিক পূব আকাশে ভােরের আলােয় কিংবা চাঁদনীরাতের জোৎস্নাধারায় , স্কুল বিল্ডিং - এর অবগাহনের ছবি , প্রাত্যহিকী অবস্থানের মধ্যেই । ছিল । কিন্তু হঠাৎ করে রঙ চটে যাওয়া দেওয়ালে রঙের প্রলেপ , প্লাষ্টারহীন দেওয়ালে রাজমিস্ত্রীদের কনিকের ছোয়া , রাস্তার মােড়ে ব্যানার , ফেস্টুন , সর্বোপরি চায়ের দোকানে , রাস্তার মােড়ে , স্কুল লাগোয়া শিবমন্দিরের চাতালে সর্বত্রই স্কুলকে ঘিরে একটা চাপা গুঞ্জন , মনে করিয়ে দিলো পঞ্চাশটি বছর পেরিয়ে এসেছে ।
আমাদের স্কুল – “ মনসুকা লক্ষ্মীনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ' । অর্থাৎ বয়স বাড়ছে । বয়স বাড়ে যেমন আমার , আপনার , পৃথিবীর । কালের কপোলতলে তিল তিল করে বেড়ে ওঠার ঘনীভূত অনুভূতির সাথে অনাগত দিন গুলির ভুল উত্তরণের প্রত্যাশা জাগে । সাধ হয় , আনন্দ বেদনার মুহুর্তগুলি উৎসবের ফ্রেমে ধরে রাখতে । তাই চলে তারই আন্তরিক আয়ােজন । ‘ পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি তথা সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব , - হােক না অনাড়ম্বর , থাক না ত্রুটি বিচ্যুতির দায় , তবুতে প্রাণের পরশ মিলবে উৎসবের আঙিনায় । তােমার আমার মিলিত আগমনে , মধুর আলাপনে । আর কিছু না পাই , ক্ষণিকের তরে প্রিয় শিক্ষক মহাশয়দের হার্দিক সান্নিধ্যের ছোঁয়া তাে পাব । সেটাই বা কম কী । ঢং ঢং করে ঘণ্টাপড়ার ভয় নেই । নেই কোন তাড়া পড়া মুখস্ত করার , স্যারেদের বকুনি কিংবা অভিভাবকের ধমকানি । আমার মতাে অনেকেই হয়তো আজ কেউ অভিভাবক , শিক্ষক , চিকিৎসক , ব্যবসায়ী , সমাজসেবী অথবা বেকারত্বের জ্বালায়  দিনগত পাপক্ষয় ' করে চলেছি সমাজ সংসারের মাঝে । পরীক্ষার খাতায় , তােমার জীবনের লক্ষ্য কি ? রচনা লেখার সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়ার বাস্তবতা হয়তাে নেই , তবুও তাে সান্তনার উত্তাপ নেয় অনেকেই , স্মৃতি রোমন্থনে চক চুরি থেকে শুরু করে , ছােটখাটো অপরাধে । কান মোলা খাওয়া অবধি ।

   আজও মনে হয় দিন গুলি ছিল কত সুন্দর সুখের , কত শিহরণের । পাশাপাশি কিছু আবেগের কিছু ক্ষোভেরও । পরেশবাবুর ইংরাজী , সুবলবাবুর ব্যাকরণ , হেড স্যারের ( স্বর্গীয় বঙ্কিনবাবু ) জ্যামিতি , পাঠা গারের গল্পবই চাওয়া পাওয়া নিয়ে রামকৃষ্ণবাবুর সাথে মার্জিত বাদানুবাদ , - অাজও ভাবায় । কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসে , যারা আজ আমাদের মধ্যে  নেই — অথচ রেখে গেছেন শিক্ষাদানের অমূল্য স্মৃতি । 
    
 সমরেশবাবুকে মনে পড়ে । বড়দের মুখে শুনেছি তার কথা , আন্তরিকতা । ঝুমি নদীর খেয়ানাঝি ইন্দ্র দোলইকে তিনি ভােলনি ’ – স্কুল পত্রিকা ‘ উদয়নের পাতায় তারই স্মৃতি চারনায় মেলে । সেদিনের সেই ছােট্ট ঝুমি আর নেই । যৌবন এসেছে তার দেহে । তারই উন্মত্ততায় পাড় ভেঙেছে ।  হারিয়ে গেছে খেয়াঘাটের সাক্ষী বকুল। স্কুল মাঠে উৎপল গাঙ্গুলীর গল্প বলা , ঘটালে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে মাঝমাঠে নৌকাডুবি , সাঁতার না জানা আশীষবাবুর অসহায় অবস্থার কথা কি আজও ভুলতে পারি ।

ভোলা যায় না , অসিতবাবুর ফিজিক্স , পীযূষবাবুর রসায়ন , জীতেন বাবুর হোমটাস্ক । বায়ােলজি বক্সের ছুরি কঁচি নিয়ে ব্যাঙ , আরশােলা ও চিংড়িমাছের পােষ্টিকতন্ত্র ব্যবচ্ছেদ করার শিক্ষা তো দিলীপ বাবুর হাতেই । খেলােয়াড় না হয়েও , আন্তঃ শ্রেণী স্কুল লীগে কাপ্টেনগিরির তাগিদ অনুভব করার পাশাপাশি মায়ের আঁচল থেকে চুরি করা  পয়সায় খেলা শেষে টীমের বন্ধুদের লজেন্স / ট্রফি খাওয়ানাের কথা মনে আসে । মনে পড়ে ‘ শিক্ষক বনাম ছাত্রদের খেলায় , এলাকার সেরা  গলকিপার অমিয়বাবুর সাথে অন্যান্য শিক্ষক মহাশয়দের চমকপ্রদ খেলা ।

    স্কুলের জন্য মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে অস , মাটি ফেলার কাজে সব সময়ই পাশে থেকেছেন , উৎসাহ প্রেরণা দিয়েছেন - গণপতি বাবু , বিজয়বাবু , মদনবাবু প্রমুখ । ওনাদের কল্যাণেই শিখেছি সমাজসেবার প্রথম পাঠ । আমাদের মধ্যে একটু একটু করে সাংস্কৃতিক ভাবনাকে প্রসারিত করেছেন , সুভাষবাবু , শম্ভুবাবু ।  স্কুলজীবনে সুভাষবাবুর চড়া গলায় সুমধুর শাসন ও আন্তরিক সাহচর্য্য যদি না পেতাম হয়তাে আমার লেখনীর সাধ্য হতাে না স্মরণিকার পাতায় কিছু তুলে ধরার ।
 হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে মনে পড়ে বুদ্ধিবাবুর অকৃত্রিম ভালবাসা , সরস্বতীপূজার আঙিনায় পণ্ডিত মশাই এর ( দীনবন্ধু মিশ্র ) স্মৃতি , - নরঃ,  নরৌঃ , নরাঃ , আর নিমাই বাবুর শেখানাে পি , কে , দে সরকারের গ্রামার  । স্কুলের কাছাকাছি থাকার সুবাদে স্কুলের নতুন পুরাতন সমস্ত শিক্ষক মহাশয়দের আন্তরিক সান্নিধ্য লাভে শুধু আমি গর্বিতই নই , তাদের  প্রতি আমার গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধা চির জাগরুক থাকবে , — আশা রাখি ।
কর্মময় জীবনে নিত্য আসা - যাওয়ার পথে ,  সাইকেলে করে আসা কালীবাবুর কুশল জিজ্ঞাসা  আর প্রতি শারদীয়া পূজায় তার ঘনিষ্ট মেলামেশা গভীর শ্রদ্ধার উদ্রেক করে । তাই আজ মনের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বকে মেলাতে গিয়ে বারে বারে বলতে ইচ্ছে করে , 
“ আমি কী ভুলেছি সব 
স্মৃতি , তুমি এত প্রতারক । ”

এত কথা মনে হতো না কিংবা অনুভবের  তাগিদও থাকতাে না , যদি না আসতো স্কুলের  পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি উৎসব । এই উৎসবকে ঘিরে কত কথা , কত আলােচনা সমালােচনা , পারস্পরিক বােঝাপড়ার কতাে অভাব । অথচ এরই পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মােড়কে , উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তােলার আহ্বান । তাই নাইবা পেলাম রঙীন খামে উৎসবের আমন্ত্রণ । তবু “ বাঁধনহারা মন কি রবে ঘরে বাধা । ” 

Shyamal Kumar Rong

আমি মনসুকা খবরের এডিটর। মনসুকা খবরে আপনি যেকোনো খবর, ভিডিও, তথ্য বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আপনার তথ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫৭৩২৫২৫

Previous Post Next Post
Mansuka Khabar

বিজ্ঞাপন

Mansuka Khabar