বিষয় :: "দীঘার অতীত ও ভবিষ্যৎ"
প্রাচ্যের ব্রাইটেন , Brighton of Calcutta , পূর্ব ভারতের গোয়া নামেও অভিহিত সৈকত শহর দীঘা । পশ্চিমবঙ্গ তো অবশ্যই ,এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষের পর্যটন শিল্পে একটি বিশেষ জায়গা প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে বাঙালি প্রেমের প্রথম আউটডোর দীঘা ।
সুদীর্ঘ বালু'সৈকতের উপর গর্জন সহকারে থেকে - থেকে ঢেউ আছড়ে পড়া , ভেজা বালির সমতলভূমি -এর উপর প্রভাতের কুসুমসূর্যের সোনাঝরা রোদ্দুর সমগ্র দীঘাকে যেন এলডোরাডোতে পরিনত করে , রুপালি জোৎস্নাপ্লাবিত দীঘা দিক-দিগন্তহীন রুপার সাম্রাজ্যে রুপান্তরিত হয়ে ওঠে , রাস্তার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেয়া গাছের মাথা উঁচানো , বীজ ছড়ানো বালি আড়ির উপর সারি-সারি ঝাউ গাছের আড়াল থেকে সূর্যের উঁকি দেওয়া , চোখ ধাঁধানো সাজানো - গোছানো সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন সারি -সারি হোটেলের আকাশচুম্বী অট্টোলিকা , মনমুগ্ধকর দীঘার গেট , বিশ্ব-বাংলার স্মারক স্তম্ভ , মনোহরন এ্যকোরিয়াম , বাঁধানো রাস্তাঘাট , অতিসক্রিয় থানা , সুপার স্পেশালিস্ট হসপিটাল , রেল স্টেশন , অমরাবতী পার্ক, বিজ্ঞান কেন্দ্র , পেট্রোল পাম্প , ডিপ্রো , দীঘা আই-আই-টি , জাহাজের আদলে নির্মিত সিপিং অফিস সুন্দরী দীঘাকে অনন্য সুন্দরী দীঘাতে পরিনত করেছে ।
এমতাবস্থায় দাঁড়িয়ে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে , আগামী ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে , আজকের জমজমাট দীঘা, আর জমজমাট থাকবে না । অর্থাৎ দীঘা পরিনতি হতে পারে আমোদ -প্রমোদ -হুল্লোড়- অতিব্যাস্ততা হীন শান্তসৃষ্ট নিরিবিলি সাদামাটা জায়গায় । আমার এই ভবিষ্যত বাণী মুলক বক্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত তার বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দীঘার অতীত জীবনে ।
অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৭৭৩ প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস উড়িষ্যা থেকে কলকাতায় ফিরছিলেন জলেশ্বর বীরকুল কাঁথি হয়ে । তখন বীরকুল ছিল চাকলা মেদিনীপুরের ৫৪ পরগনার একটি পরগনা । ওয়ারেন হেস্টিংস এই বীরকুলের অজস্র বালি রাসির সমুদ্র সৈকতের উপর আছড়ে পড়া ঢেড় , ঝাউ , কেয়া বনের অপরূপ সৌন্দর্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখে মুগ্ধ হয়ে যান এবং ১৭৭৫ সালে বীরকুলে একটি বাঙলো বানান । ইংরেজ সাহেবরা স্বস্ত্রীক ছুটি কাটাতে গিয়ে এই বাঙলোতে রাত্রীযাপন করতেন । তখন বর্তমানের দীঘা থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র ছিল , বীরকুলের নাম দীঘা হয়ে ওঠার পিছনে মতান্তর থাকলেও , অতীতের বীরকুল দীঘা নামে পরিবর্তীত হয় । তারপর কলকাতার বিখ্যাত হ্যামিলটন কোম্পানির মালিক জন ফ্রাঙ্ক স্নেহথ ১৯২১ সালে রেলে করে খড়গপুর আসেন , সেখান থেকে বেলদা হয়ে কাঁথি হয়ে দীঘায় পৌঁচ্ছান হাতির পিঠে চড়ে । এবং জন ফ্রাঙ্ক স্নেহথ ১১.০৫ একর জমির উপর বসাবাসের জন্য রানউইক হাউস নামে একটি বাড়ি তেরী করেন , এবং ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর পশ্চিম বঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ড: বিধান চন্দ্র রায়কে অনুরোধ করেন যে কলকাতা থেকে দীঘার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে , এবং তিনি আধুনিক দীঘার স্বপ্ন দেখতেন । জন ফ্রাঙ্ক স্নেহথ ছিলেন দীঘার প্রথম বাসিন্দা , রানউইক হাউস আজ ইলেকট্রিক অফিসে রুপান্তরিত হয়েছে । কালের ক্ররাল স্রোতে ওয়ারেন হেস্টিংস বাঙ্গলো সমুদ্রগর্ভে তলীয়ে গেলেও জন ফ্রাঙ্ক স্নেহথের বাড়ি সহ কবর স্থান অতীত ইতিহাস বুকে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে ।
এই হল দীঘার অতীত কাহিনীর কিয়দাংশ , দীর্ঘ ২০ বছর ক্রমপর্যায়ে আমার দীঘা যাওয়ার সুবাদে আমার মনে হয়েছে যে মাত্র কয়েক বছর আগে বর্তমানে যেটা ওল্ড দীঘা বলে পরিচিত সেটাই সুন্দরী দীঘা ছিল , মানুষ ওখানেই বেড়াতে যেত , আর বর্তমানে নিউ দীঘা বলা হচ্ছে সেখানে ঝাউয়ের জঙ্গল ছিল । বর্তমানে নিউ দীঘার জল অতীতের চেয়ে ঘোলা ও উত্তাল সমুদ্রের দূর্ঘটনাকামী ভয়ঙ্কর এলোপাতাড়ি ঢেউয়ের কারণে উদয়পুরের সমুদ্র সৈকতে মানুষ ভিড় করছে । জলস্তর বেড়ে নিউ দীঘা ওল্ড দীঘাতে পরিনত হচ্ছে , কিছু দিন পরে জলস্তর বাড়তে বাড়তে ক্রমে - ক্রমে উদয়পুর ওল্ড দীঘাতে পরিনত হবে এই ভাবে সমুদ্র সৈকত উড়িষ্যার দিকে সরে যাবে আর দীঘার জলস্তর বেড়ে ঢলঢলে জলরাশির শুনসান - অতিব্যাস্ততাহীন সাদামাটা জায়গায় পরিনত হবে বলে আমার মনে হয়েছে তাও আবার ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে ঠিক যেমন করে কৈশোর যৌবন অতিক্রম করে বার্ধক্য আসে । এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত মত । এটাই দীঘার ভবিষ্যত আমার অনুমান ।
এই ঘটনা ঘটার পিছনে প্রধান কারণ হচ্ছে জল স্তর বৃদ্ধি। নানা রকম ভাবে বায়ু দূষণের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমরেখার উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যেটা বলা যায় যে এই হিমরেখা বৃদ্ধির কারণে পর্বতের বিপুল বরফ বা উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুতে বরফ গলে জলে পরিণত হচ্ছে। যে কারণে সমুদ্রের জল স্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে । ওল্ড দিঘা বেশ কিছু বছর আগে জল কম থাকায় মানুষের ব্যবহারযোগ্য ছিল কিন্তু বর্তমানে জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ সাধারণভাবে আর ব্যবহার করতে পারছেন না। পাশাপাশি তুলনামূলক নতুন দীঘা জলস্তর কম থাকায় ওখানে মানুষ সমুদ্র সৈকত থেকে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে শুরু করে কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে নিউ দিঘা তে জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে । এই কারণেই নিউ দীঘা একদিন ওল্ড দিঘার মত হবে বলে আমার অনুমান এই জলস্তর বৃদ্ধির কারণে।
---- লেখক - রাজীব রং
---- তারিখ - ২১/০২/২০২১
Tags
West Bengal