“স্মরণের এই বালুকাবেলায় চরণচিহ্ন আঁকি,...”
(অর্ধশতক পূর্বের এক বিদ্যালয় প্রাক্তনের মধুর স্মৃতিচারণা, ১৯৪৪-৪৯)
[সূত্র:– আবারো অনুজের চিঠি—একেবারে স্বয়ং স্মারক গ্রন্থ উপসমিতির আহ্বায়ক সম্পাদক এমন সুভাষ চৌধুরীর চিঠি। কী ব্যাপার? লেখা চাই। জীবনের প্রথম শিক্ষা। মাতৃভূমি মনসুকা বিদ্যালয় তার ৫০ বর্ষ পূর্তি উৎসবে স্মারকগ্রন্থ বের করছে। অতএব...। বুঝলাম। কিন্তু...। পূজার আগেই? এদিকে কাজে হিমসিম, অচিরেই দূর ভ্রমণে পাড়ি দেওয়ার কথা। এদিকে অবসরের ঘণ্টা বেজে গেছে। অসম্ভব চাপ চলছে। তবু এ যে মনসুকা বিদ্যালয়—চিরদিনের মনোমাতৃভূমি, শিক্ষাজীবনের আদি গঙ্গা। আবার অনেক কাজের অভিভাবিকাও বটে, তাই...। অতএব...। ঐ বিদ্যালয়েই এক উৎসবের উদ্দেশ্যে রচিত হয় লেখাটি। ২৭-৫-৯৪-তে তারই সংযোজন-বিয়োজন জনিত কারণে বর্তমান রূপটি রচিত।]
কথামুখ
“স্মরণের এই বালুকাবেলায়
চরণচিহ্ন আঁকি,
তুমি চলে গেছ দূর, বহু দূরে –
শুধু পরিচয়টুকু রাখি।”
সুদূর কৈশোরের স্মৃতিপটে যে চরণচিহ্নগুলি আঁকা হয়েছিল দিন হতে দিনে, তারে আজ বার্ধক্যের বালুকাবেলার তীরে বসে ফেরাই কেমনে! যে পদচিহ্নে একদিন সাক্ষাৎ প্রণতি জানিয়েছি বারে বারে বিদ্যামন্দিরে প্রথম প্রবেশক্ষণে, পরীক্ষার পূর্বে, পরীক্ষাফল প্রকাশক্ষণে, কিংবা বিদ্যাদায়িনীর পূজাপ্রাঙ্গণে, নববর্ষের প্রথম প্রভাতে, পূজাবকাশের পরে প্রথম যোগদান দিনে, আবার হয়ত বা স্মৃতিবার্ষিকীর সভায় পুরস্কার গ্রহণের পরে, কিংবা এসবেরও বাইরে পথে-প্রান্তরে, হাটে-মাঠে-ঘাটে-বাটে, বাজারে-দোকানে, গৃহে-গৃহান্তরে, পূজার মণ্ডপে, উৎসবের আঙিনায়, যাত্রার আসরে বা নাটকের রঙ্গশালায়—যখনই যেথায় পেয়েছি দেখা সেইসব গুরুমহাশয়দের, তখনই সেথায় সাগ্রহে তাদের চরণে প্রণতি জানিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছি সেদিন।
কিন্তু আজ—যে কাহিনী চল্লিশের দশকে শুরু হয়ে আজ নব্বইয়ের দশক শেষের আঙিনায় অপেক্ষারত, ছ'টি দশক শেষে বিস্মৃতির প্রলেপ সে কাহিনীতে তো পড়বেই আষ্টেপৃষ্ঠে। তাই, সে প্রলেপের গাঢ় আস্তরণকে সরিয়ে কতখানিই বা সেই চরণচিহ্নকে খুঁজে পাব, আজ আর তা বুক ঠুকে বলতে পারছি না। ভরসা এই যে, চরণচিহ্ন মিলিয়ে গেছে চরণেরই সাথে, তার দেহীর সাথে, কিন্তু তার পরিচয়টুকু? সে তো রয়ে গেছে আজও যারা বেঁচে আছে, তাদেরই মনে, অতি সঙ্গোপণে। হ্যাঁ, সেই পরিচয়ের সূত্রই আমার আজকের এই স্মৃতিচারণার একমাত্র পথ চলার পাথেয়কণা। জানিনে, এ মধুর স্মৃতিচারণার অঙ্গনে যাদের স্মরণে এনে মননপূজার বেদী 'পরে বসাচ্ছি, তাদের মধ্যে আজও ক'জনই বা বেঁচে-বর্তে আছেন ইহলোকে। অন্তত বিদ্যামন্দির-প্রাঙ্গণে তাদের আর একজনেরও যে পদরেণু মিশে নেই, সেটুকু হয়ত বাস্তব সত্য, একমাত্র একজন ছাড়া—যাকে আমরা মাত্রই কয়েক বছর আগে বিদায় অভিনন্দনে ভূষিত করে নিজেদের কৃতার্থ মনে করেছি। আমি শ্রদ্ধেয় প্রাক্তন শিক্ষাগুরু শ্রীযুত বুদ্ধিমন্ত বেরা মহোদয়ের কথা বলছি। কথামুখ হলো শেষ, শুরু হোক স্মৃতিচারণা...
১. স্মৃতিচারণ
সে ছিল চল্লিশের দশক, পরাধীনতার নাগপাশ সেদিন জাতির শরীরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, সন ১৯৪৪ সাল। ‘ঝুমি’ নদীর এপারে মেঠেল দীর্ঘ গ্রাম আমার মাতৃভূমি, আর ওপারে মনসুকা আমার প্রথম শিক্ষা মাতৃভূমি। দুই ভূমিই তাই আমার চিরপ্রণম্যা, প্রাতঃস্মরণীয়া, আমার ইষ্টদেবীসমা।
ঐ সালেরই জানুয়ারির এক শুভদিনে বড়কাকাবাবু (ঐ অঞ্চলের সুপরিচিত জন প্রয়াত বিশ্বনাথ চৌধুরী মহাশয়)-এর সাথে চলেছি বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হওয়ার আশায়। কিন্তু ঐ পুণ্যভূমিতে যাওয়ার আগেই এপারের মানুষদের তখন ‘ঝুমি’ নিজেই একটা করে পরীক্ষা নিত। সে পরীক্ষা প্রায়ই চলত, অনেকেই তাতে অকৃতকার্যও হত। আমিও বাদ গেলাম না। পারাপারের জন্য তখন নদীর ঘাটে থাকত একজোড়া তালগাছের ডোঙা। নৌকা বা ডিঙি এসেছে অনেক পরে। নদী ছিল গভীর, জল থাকত বেশ। সে সময়টায় আবার নদীতে বাঁধ থাকত বোরো চাষের জন্য। ‘নীল যমুনার জল’ যেন ফুঁসত সব সময়। ভারী চমৎকার লাগত শীতের নিসর্গ প্রকৃতিটাকে! চারিদিকে রবিশস্য আর আখের গুড়ের গন্ধে চারিদিক যেন ম-ম করত! ঠিক এমন দিনে এমন ক্ষণে চলেছি ঘাটাল মহকুমার শস্যভাণ্ডার সেই মনসুকাতেই। তার আগে আর কখনো যাইনি। তো, প্রথম দর্শনেই জায়গাটাকে ভালো লেগে গেল! আরও ভালো লাগল যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। তাই একই সঙ্গে মনসুকা ও তার বিদ্যামন্দিরকে ভালবেসেই ফেললাম। শুরু হল নতুন যাত্রা। এক অজানা দিগন্তের দ্বার যেন খুলে গেল সেদিনের কিশোরের চোখের সামনে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরছি। আবার ঝুমি, আবার ডোঙা। আসার সময় ঝুমি ছিল নীরব দর্শক হয়ে। ফেরার সময় সে কি আর ছাড়ে? পরীক্ষা দাও, তবে বাড়ি যাও। এপারে ডোঙা লাগতেই কাকাবাবু বললেন, “নে, নাম দিকি দেখি।” মারলাম এক লাফ। সঙ্গে কে যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল? ইস, ঝুমি! কেন, কী হলো ব্যাপারটা? ও, তাই বলো? আমি যে তখন পপাত ভূমিতে। পোশাক-খাতা সবই গেল ভিজে। কাকাবাবু বললেন, “হুঁ! তোর কিছু হবেনি।” হলোনি তো হলোনি, কী আর করব? কিন্তু সেই শুরু। ঝুমির পরীক্ষায় আরও কয়েকবার অকৃতকার্য হয়েছি বটে, কিন্তু বিদ্যালয় আমায় ঠকায়নি, তাই আর ফিরে তাকাতে হয়নি কোনোদিন।
দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছরেরও উপর এই মাতৃসমা পুণ্যভূমির স্পর্শ পেয়ে নিজেকে তিল তিল করে গড়েছি, ধন্য হয়েছি। পিতৃসম গুরুমহাশয়দের স্নেহের দাক্ষিণ্যে, তাঁদের চরণতলে বসে, দিন হতে দিনে, মাস হতে মাসে, বছর হতে বছরে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছি। খুবই গরীব ছিলাম, পরের বাড়িতে পরের বই পড়ে পড়া তৈরি করতাম। অর্ধেক দিন ঠিকমতো আহারই জুটত না, পোশাক তো নয়ই। কিন্তু এ ছিল আমার অবস্থার দারিদ্র্য, শিক্ষাকে সে কাবু করতে পারেনি, পারেনি রোগশোকও। হ্যাঁ, ‘নিঠুর দরদী’ বিধির হয়ত এদিকটায় আমার প্রতি কিছুটা বেশিই দরদ ছিল। তাই হয়ত চলার পথের এই সব নুড়ি-পাথরকে, বাধাকে অমিত বিক্রমে পার হয়ে এসেছি সেদিন, সবদিন এবং আজও। বিদ্যালয়ে খেলাধুলা ছিল, আনন্দ-গান ছিল, ছিল পরীক্ষা-প্রস্তুতির তীব্র প্রতিযোগিতার মহড়া। সে এক অনাস্বাদিতপূর্ব পুলক শিহরণ! তারপর ফল ঘোষণার প্রাক্-মুহূর্তের সেই মানসিক রোমাঞ্চ ও টানটান উত্তেজনা! উঃ! ভাবা যায়! শিক্ষাগুরুগণ একে একে উঁচু শ্রেণীতে ওঠার নাম ডেকে চলেছেন, আর আমরা ছাত্রছাত্রীরা ঠকঠক করে ‘গড়’ (প্রণাম) করে চলেছি তাঁদের চরণতলে। অঙ্কে কাঁচা ছিলাম, বিজ্ঞানও তেমন করে আমায় টানত না। তবু প্রতি বছর প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান ছাড়া তৃতীয় স্থানে কখনো গেছি বলে মনেই পড়ে না।
প্রথম স্তরীয় শিক্ষার শিক্ষাগুরুবৃন্দ
আমাদের নীচু শ্রেণীর ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত রামপদ পেড়ে মহাশয়। তার হাতেই আমার ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি, তিনিই শেখান ইংরেজি আবৃত্তি। অর্ধশতকেরও আগে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর নিতান্ত নাবালক ছাত্রকে আবৃত্তি শিখিয়ে, সাহস জুগিয়ে স্মৃতিবার্ষিকীর মতো বিরাট জনসভায় পাঠও করিয়েছিলেন। তাও ইংরেজিতে। সে আবৃত্তি শুনে আমার বড় কাকাবাবুও মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেন বলে শুনেছি। পরের বছর বা তারও পরে কিনা মনে নেই, ইংরেজি আবৃত্তি করে আরও চমক দেওয়া গেল “Psalm of Life”-এর মতো দীর্ঘ ও কঠিন কবিতাটি আবৃত্তি করে। এবারে অবশ্য রূপকার ছিলেন শিক্ষাগুরু মহেন্দ্র পাড়ুই (?) মহাশয়। চারদিকে জয়জয়কার পড়ে গেল। বড় কাকাবাবু এবার আমায় আশীর্বাদ করলেন। তিনিই প্রথম দিনে বলেছিলেন, “হুঁ! তোর কিছু হবেনি।” এদিন থেকেই বোধহয় তিনি আমার প্রতি ধারণাটাই জীবনের মতো বদলে নেন।
অঙ্ক ও ভূগোলে ছিলেন প্রয়াত রাখালচন্দ্র পাখিরা (?) মহাশয়। চেহারায়, পোশাকে, শিক্ষাদানে, দরাজ গলায় ও শাসনে প্রকৃতই এক নিখাদ গুরু বা মাস্টারমশাই ছিলেন। দেখলেই সম্ভ্রম জাগত, খুব কড়া শাসনে রাখতেন, পড়াও ঠিক ঠিক আদায় করা চাই-ই চাই। এক সম্ভ্রম জাগানো ভয়ে তার নজরে পড়তে চাইতাম না। সম্ভবতঃ খদ্দরের ধুতি আর হাফশার্টই তাঁর পরিধেয় ছিল। পায়ে থাকত সেকালের স্যান্ডেল বা চটি। কিশোর মনে ভক্তি যেন আপনা থেকেই জাগত। প্রায় সকল শিক্ষাগুরুরই এই একই রকমের পোশাক ছিল।
শ্রেণী বদলের সঙ্গে শিক্ষকেরও ঘটত বদল। এবার ভূগোল ও মানচিত্র-অঙ্কন, ইতিহাস ও খেলাধুলায় এলেন প্রয়াত কানাইলাল দোলই মহাশয়। ইনি ছিলেন তৎকালীন জি-টি শিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। মানচিত্র আঁকা ও তাতে রঙ ফলানোর কায়দার হাতেখড়ি এঁর কাছেই হয়। এই শিক্ষাই একদিন উঁচু শ্রেণীতেও ১৪-এর মধ্যে ১২ নম্বর পেতে সাহায্য করে আমার দ্বিতীয় বিদ্যালয় জীবনে—ক্ষীরপাই বিদ্যালয়ে। এই মনসুকা বিদ্যালয়েই আমার অনেক বিদ্যার দ্বার খুলে যায়, बुनियाদ পাকা হয়ে যায়। নিজের ভেতর চুম্বক হয়ত ছিলই, কিন্তু সেরকম ইস্পাত মিশ্রিত লোহার স্পর্শও তো পাওয়া চাই, নইলে নিতান্ত খাদ-মেশানো কাঁচা লোহায় কি ঠিক আকর্ষণ ঘটে? কী জানি? আমি আবার বিজ্ঞানের ছাত্র নই যে, এ তত্ত্ব জেনে থাকব।
আরও দুটি মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন ইনি। একদিকে গল্পের জাদুকর, আবার অন্যদিকে যাত্রা ও নাটকের পাকা অভিনেতা। ভয়ানক রাশভারী এক রাজা সাজতেন বা তেজস্বী সেনাপতির ভূমিকায়। চেহারাও যেমন ছিল, গলার জোরও তেমনি ছিল। স্বভাবেও একদিকে যেমন বজ্রাদপি কঠোরানি ছিলেন, চাবুক চালাতেন বজ্রের মতোই, আবার মৃদুনি কুসুমাদপি হয়ে আমাদের সঙ্গে একাত্ম বন্ধু হয়ে যেতেন। সেদিনের শিক্ষাগুরুদের কমবেশি সকলেই ঠিক এই ভূমিকাটিই নিতেন—যা শিক্ষাক্ষেত্রে একান্ত বাঞ্ছনীয়। শিক্ষাগুরুদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা-ভক্তি যেমন থাকবে, তেমনি রোমহর্ষক শাসন, অত্যাচার ইত্যাদি না করেও কিছুটা ভয়ের ছোঁয়া শিশু-কিশোর-মনে জাগিয়ে রাখা বোধহয় ভালো। তাতে বুদ্ধিমান ছাত্রছাত্রীর কথা ছেড়ে দিলেও সাধারণ মানের ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে উপকার দেয় বেশি, কারণ ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা নিয়ে তাদের জীবনের बुनियाদটাই গড়া হয়ে যায়। আজকের মতো স্বেচ্ছাচার, অনাচার গড়ে ওঠার অবকাশই থাকে না। আজ কিন্তু ব্যাপারটার একেবারেই উল্টে গেছে হাল, তাই পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই হচ্ছে যারপরনাই নাকাল। চেষ্টা হচ্ছে, প্রকল্প গড়া হচ্ছে ভুরি ভুরি, কিন্তু সবই যাচ্ছে বিফলে। শিক্ষকই যদি তৈরি না হয়, শিক্ষার্থী তৈরি হতেই পারে না। দুঃখিত, আমি বোধহয় প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছিলাম। এই বিশেষায়নের যুগে একজন অ-শিক্ষক সমাজের লোকের এসব মন্তব্য করা ঠিক না।
হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। বিজ্ঞান, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলায় ছিলেন প্রয়াত সাধনকুমার জানা মহাশয়। প্রতিবন্ধী হয়েও তার সব কাজে, অদম্য উৎসাহ দর্শনে আমরা শুধু হাঁ করে ভাবতাম! ইনি একই সাথে ছিলেন নট, নাট্যকার, রূপকার, ও নাট্য-শিক্ষক। বোধহয় রক্তেই তার নাট্য উপাদান মিশেছিল। তখনকার দিনের মনসুকায় নট-নাটক-নাট্যায়ন-এর পুরো ব্যাপারটাই যেন তিনিই প্রথম আমদানি করেন। পরে এবিষয়ে সহকারী হয়ে যোগ দেন আর এক নাট্যব্যক্তিত্ব—তিনি প্রয়াত মদনমোহন বেরা মহাশয়। আরও পরে যোগ দেন পূর্বোক্ত শিক্ষাগুরু প্রয়াত কানাইলাল দোলই মহাশয়। এই শেষোক্ত দ্বয়ের তেজোদৃপ্ত অভিনয় সত্যিই মনে রাখার মতো।
আমাদের এপারেও যেমন বরকতিপুরের গাঁ-শীতলার মন্দির-প্রাঙ্গণে রায়-সেনবাড়ির যৌথ উদ্যোগে প্রায়ই চলত নাট্য-রূপায়ণ। প্রয়াত বিশ্বনাথ রায় মহাশয় ছিলেন এখানের নটগুরু। চেহারাও যেমন ছিল, অভিনয়-ক্ষমতাও তদ্রূপ। তাঁর ছেলেরাও এখন মন্দ করেন না যাত্রাভিনয়। সেন বাড়ির লোকেরাও বেশ ভালো অভিনয় করতেন। অজিত সেন বলে একজন ছিলেন। সদাহাস্যময়। স্ত্রী ভূমিকা নিতেন। বড় ভালো লাগত। “দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না—সেই-যে আমার, নানা রঙের দিনগুলি।”
আরও উঁচু শ্রেণীতে ইংরেজি ব্যাকরণ ও সংস্কৃত পড়াতেন প্রয়াত তপস্বীচরণ পোড়ে মহাশয়। গঠনে, আচরণে আর কর্তব্য পালনে সত্যিই তিনি তপস্বীর ভূমিকা নিয়ে গেছেন। নিজের কাজে যেমনি নিয়নিষ্ঠ, তেমনি সময়ানুবর্তী। ছাত্রের কাছ থেকে পড়া আদায় কেমন করে করতে হয়, তা তিনি জানতেন। গ্রামারের খুঁটিনাটি তিনি নিপুণভাবেই শেখাতেন। ইংরেজির তিনজন প্রথিতযশা শিক্ষক ছিলেন। নীচু ও মধ্যম স্তরে ছিলেন ইনি—গ্রামারে, আর একটু উঁচুর দিকে ছিলেন মাস্টার কাকাবাবু গ্রামার ও অনুবাদ শিক্ষায়। আর সবার উঁচুতে ছিলেন প্রয়াত পার্বতীচরণ মণ্ডল মহাশয় সাহিত্যে, গ্রামারে ও টানা মানে শেখাতে। যারাই এই ত্রয়ীর কাছে এ ভাষা শিক্ষা পেয়েছেন, তাদেরই জীবন আলোকিত হয়ে গেছে বলেই আমার বিশ্বাস।
ছাত্র-ছাত্রীদের মৃদু শাসনও করতেন। মাথায় গাঁট্টা মারতেন ও কান টেনে দিতেন। একই সঙ্গে অঙ্কে ও অবস্থায় দরিদ্র ছিলেন বলে তিনি দয়াপরবশ হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আমায় গৃহশিক্ষকতাও করেছেন কিছুকাল, ঠিক যেমন করেন দীর্ঘকাল ধরে আমার কাকাবাবু সুবলচন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ও। এই দুই মহাপ্রাণের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্যই রয়ে গেছে এ জন্মের মতো। স্বল্পদিনের জন্য হলেও আরও একজনের কাছে ঋণী আছি। তিনি ছিলেন অনেক উঁচু শ্রেণীর (নবম) অঙ্ক ও বিজ্ঞানের নতুন শিক্ষক “কুণ্ডুবাবু”, পুরো নামটি মনে নেই। ক্ষীরপাই বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন আমি আরও একবার মনসুকা বিদ্যালয়ে ফিরে এসে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হই। সে সময় এই তরুণ, স্নিগ্ধ ও উচ্চ শিক্ষিত মানুষটির সুমধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হই। এঁর নতুন আদর্শে আমরা মুগ্ধ হই। ইনি সবকিছু গ্রাম্যতা, নীচতা থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দিতেন। কিছুদিন কাটিয়ে আমি ফিরে যাই আবার ক্ষীরপাই বিদ্যালয়ে, এই নতুন গুরুমহাশয়ও বেশি দিন থাকেননি।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, মনসুকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার সামূহিক পাঠ্যজীবন বিনা বেতনে চালাবার ঢালাও অনুমতি দিয়ে আমায় ধন্য করেছিলেন। আমি চিরকৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। ক্ষীরপাই বিদ্যালয়ও অর্ধবেতনে পড়ার অনুমতি দিয়ে আমায় চিরঋণী করেছে। আমার পরবর্তী যা কিছু শিক্ষা, তা সবই চাকরি করতে করতে হয়েছে, আজও যার শেষ নেই। কিন্তু বিদ্যালয়ী পাঠ্যজীবন চালাতে যদি প্রাগুক্ত বিদ্যালয় দুটি এগিয়ে না আসত, তবে জীবন হয়ত অন্য খাতেই বইত আমার। বলতে ভুলেছি, মনসুকায় প্রথম ভর্তির দিনে যে শিক্ষক মহাশয়ের সাথে পরিচয় হয়, তিনি প্রধান শিক্ষক শ্রীপ্রধান। বেশ সৌম্য ও নিরীহ মানুষটি ছিলেন। তখন বিদ্যালয়টি ছিল মধ্য ইংরেজি (এম-ই) বিদ্যালয়, অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পরে আমরা যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলাম, তখনই গুটিকয় ছাত্র নিয়ে সপ্তম শ্রেণী খোলা হলো। এই শ্রেণীতে বেশিরভাগ পাঠ নিতেন চন্দ্র ও সূর্য, অর্থাৎ মাস্টার কাকাবাবু ও পার্বতীবাবু। এঁদের প্রথম জনের হাতে ছিল অঙ্ক ও বাংলা, দ্বিতীয় জনের হাতে ইংরেজির পুরো সাম্রাজ্যটি। প্রধান তিনটি বিষয় নিশ্চিন্ত হলো। বাকিগুলির জন্যও কিছু নতুন নিযুক্তি হতে থাকল। শিক্ষাগুরুগণ যেন একটি মালার মতো এ বিদ্যালয়ের বুকে জড়ানো ছিল সেই সে প্রথম যুগে। আর এই মালার সুবাসে দূরদূরান্ত থেকে মধুমক্ষিকারূপী ছাত্রছাত্রীর দল ছুটে আসত। প্রথম স্তর শেষ হলো।
দ্বিতীয় স্তরীয় শিক্ষার শিক্ষাগুরুবৃন্দ
এই স্তরে এসে পেলাম আমার ‘মাস্টার কাকাবাবু’ তথা বর্তমান স্মারকগ্রন্থ-এর আহ্বায়ক সম্পাদক সুভাষ চৌধুরীর প্রথিতযশা পিতৃদেব প্রয়াত সুবলচন্দ্র চৌধুরী, সংস্কৃতের পণ্ডিত মহাশয় (নাম মনে নেই) এবং সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ও আমার শেষ শিক্ষাগুরু শ্রীযুত বুদ্ধিমন্ত বেরা মহোদয়দের। এখানেই পাই প্রয়াত জহরলাল বক্সী মহাশয়কে, যিনি ছিলেন বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। ‘ভারত স্বাধীন করল যারা’ প্রভৃতি পুস্তক প্রণেতা ছিলেন। এসব বই দ্রুতপাঠ্য হিসাবে পড়তে হত। পড়াতেন ইংরেজি। কী যেন গণ্ডগোলে চলে গেলেন। এলেন অচ্যুতবাবু (চক্রবর্তী) (?)। দাঁত ছিল এঁর অল্প, তাই পড়ানো খুব একটা স্পষ্ট হত না। গোঁফ ছিল দারুণ। ছিলেন অনেককাল। এলেন কটা রঙধারী এক শিক্ষক মশায়। বিদ্যালয়ের পাশে সপরিবারে থাকতেন। ইংরেজি পড়াতেন আর খুব বেত চালাতেন। অপরিচ্ছন্ন পোশাকেই বেশি থাকতেন। আমাদের অস্বস্তি লাগত খুবই। নামটি তাঁর অজানাই রয়ে গেছে আমার। এলেন মহেন্দ্রবাবু (পাড়ুই, না, পোড়ে?) প্রমুখ। মহেন্দ্রবাবু ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষক। পরীক্ষাগার (ল্যাবরেটরি) তো ছিল না, তাই চেয়ারে বসে সেই নানা রকম হাত ঘুরিয়েই বিজ্ঞানের জটিল কুটিল পরীক্ষাগুলি বোঝাতেন। একে বিজ্ঞান ও অঙ্ক নাম শুনলেই আমার মাথায় অন্তত পরপর দশটা বজ্রাঘাত তো পড়েই। তাই এই পিরিয়ডটা আমার অসহ্যই লাগত। উপায় খুঁজতে লাগলাম। এই বিজ্ঞান ও অঙ্ককে ঠেকিয়ে বেশি নম্বর তোলার জন্য একটি ঐচ্ছিক বিষয়ের সন্ধানে রত হলাম। পেয়েও গেলাম পৌরবিজ্ঞান। ঠিক মনে নেই, মনসুকায়, না, ক্ষীরপাই-এ নবম শ্রেণীতে এই নতুন বিষয়ের উপর পড়াশুনা শুরু করলাম পূর্ণোদ্যমে। তবে এই স্তরের শেষোক্ত জনেরা তেমন করে কিশোর মনে দাগ কাটেননি। প্রাগুক্ত বাকি জনদের কথা বলে শেষ করা যায় না, যাবে না। আর সে পরিসরও এখানে নেই। আজ জীবনের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশ্যে আমার সকৃতজ্ঞচিত্তের প্রণাম জানাই বারবার।
তৃতীয় বা শেষ স্তরীয় শিক্ষাগুরুদ্বয়
এটিও দ্বিতীয় স্তরেরই অঙ্গ, কারণ যাদের কথা বলতে যাচ্ছি, তাদের আমরা আগেই পেয়েছি, বলেছিও কিছু কিছু। শুধু দু'জনের সম্বন্ধে বিশেষভাবে বলার জন্যই এই অংশটিকে একটু আলাদা স্থান করে দিয়েছি এবং ‘বৃন্দ’-এর জায়গায় ‘দ্বয়’ও বসিয়েছি। এটি বাস্তবের চিরকালীন প্রয়োজন, কারণ, “ঈশ্বরচন্দ্র-সুবলচন্দ্র-পার্বতীচরণ”—এই যে তিনটি স্তম্ভ, এর উপরেই যেমন সেদিনের মনসুকা বিদ্যালয় গঠিত হয়েছে, আজও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এ তিনের মননেই এসেছিল আগে এই বিদ্যালয়। তারপরে তার বাস্তব রূপ পেয়েছে। উৎসর্গীকৃত এ তিনের হোমযজ্ঞেই আহুতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজকের মনসুকা বিদ্যালয়। এত ভালোবাসা, এত বাৎসল্য একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি! হ্যাঁ, তাই। এ ভাবা যায় না, আজকের এই স্বাধীনোত্তর দেশের তথা মনসুকার মাটিতে দাঁড়িয়ে! আজ এমন দেবদূতদের আমরা কি আর দেখা পাব? কী করে পাব? সে ঔরস কই? কই সে গর্ভ? সে যুগ আর কি ফিরে আসে না? হয়ত না, আবার হয়ত আসে, তবে তার জন্য বহু সাধনা ও আরাধনার যে আগে দরকার, তা কি আমাদের আছে?
এতক্ষণ আমরা গ্রহ-নক্ষত্রভরা আকাশ দেখে আসছি, এবার দেখব “আকাশভরা সূর্যতারা”। হ্যাঁ, সেই সূর্যতারার কথা, আর তার আকাশের কথা বলে এ প্রসঙ্গের যবনিকা টানি। সে সূর্য হুগলী জেলার ময়াল নিবাসী শিক্ষাগুরু প্রয়াত পার্বতীচরণ মণ্ডল মহাশয়। সত্যিই, প্রখর সূর্যের লেলিহান দীপশিখা যেন তার শিক্ষাদানে জ্বলজ্বল করে জ্বলত। কী যে গভীর ইংরেজি জ্ঞান ছিল, তা যে তার কাছে প্রত্যক্ষ শিক্ষা লাভ করেছে, সে-ই শুধু জেনেছে। আমার সহপাঠী বন্ধু রতনচন্দ্র সামন্ত (বর্তমানে ঐ বিদ্যালয়েরই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক) হয়ত ঐ একই কথা বলবে। পেশাগত দিকে তিনি ছিলেন আইনবিদ। কিন্তু পসার না জমায় তিনি শিক্ষকতায় আসেন। সেই সঙ্গে শিক্ষাজগতও এই প্রকৃত গুণীকে পেয়ে ধন্য হলো। ইংরেজি ব্যাকরণ, অনুবাদ ও সাহিত্য কেমন করে রপ্ত করতে হয়, তা এঁর পদপ্রান্তে বসে শিক্ষা করে জীবনকে ধন্য করেছি। জীবনে আর ঘুরে তাকাতে হয়নি। কেমন করে এক লাইন ইংরেজি লিখতে হয়, তা ইনিই হাত ধরে শিখিয়ে গেছেন, ঠিক যেমন বাংলায় আমার ‘মাস্টার কাকাবাবু’ সাহিত্য করার बुनियाদটি তৈরি করে দিয়ে আমায় চিরঋণী করে গেলেন জীবনভর। সেই কিশোর মন থেকে আজকের এই বৃদ্ধ মন, কিছু লেখা, কিছু চর্চা করার আগে এদের চরণেই পূজা দিয়ে বসে, স্মরণ করে, কৃতজ্ঞতার ভারে মাথাটা লুটিয়ে দেয় এদেরই চরণতলে। ধন্য তাই আমি, ধন্য জীবন আমার।
‘আকাশ’, ‘মহাকাশ’ তথা 'লক্ষ্মীনারায়ণ' ও 'ঈশ্বরচন্দ্র', ও ‘শান্তিনিকেতন’, ‘বিজয়তূর্য’ ও 'রণভেরী' তথা ‘সুবলচন্দ্র’ ও ‘পার্বতীচরণ’—'আকাশ'-এর কথা বলেছি। হ্যাঁ, এইসব গ্রহ-নক্ষত্র-তারাকে ধরে রাখার মতো এক মস্ত আকাশ ছিল, ছিল তার চেয়েও বড় ‘মহাকাশ’। ‘আকাশ’ যদি ‘মহাকাশ’-এর পিতৃদেব চিরস্মরণীয় স্বর্গতঃ লক্ষ্মীনারায়ণ সামন্ত হন, তবে ‘মহাকাশ’ ছিলেন তদীয় পুত্র মনসুকার বরেণ্য সন্তান, প্রাক্তন জমিদার তথা এ বিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ প্রয়াত ঈশ্বরচন্দ্র সামন্ত মহোদয়। ঠিক যেমন, বীরভূমের বোলপুর-ভুবনডাঙার ‘ব্রহ্মডাঙায়’ প্রথম অহল্যা উদ্ধারে এসেছিলেন একদিন রবিপিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়, আর তার পরেই ঐ ব্রহ্মডাঙার সমস্ত আকাশকে আলোয় উদ্ভাসিত করে তাকে ‘মানুষ-রবি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজকের কবিতীর্থ বা রবিতীর্থ ‘শান্তিনিকেতন’-এ রূপ দিয়ে গেলেন। এখানেও, এই মনসুকায় এই আলোর দিশারী ‘ঈশ্বরচন্দ্র’-এর হাতে ছিল দুটি প্রজ্বলন্ত দীপশিখা—এক হাতে বিজয়তূর্য ‘সুবলচন্দ্র’, অন্য হাতে রণভেরী 'পার্বতীচরণ'। এই ত্রয়ী বা ত্রিশক্তির মিলিত তূর্যনাদে সেই চল্লিশের দশকের শেষ পাদে এই বিদ্যালয় এ অঞ্চলের মধ্যমণি ছিল। ইড়পালা-বীরসিংহ-ঘাটাল বিদ্যালয়ের পরেই যার স্থান ছিল বাঁধা।
অর্ধশতকেরও পরে সে মনসুকা বিদ্যালয় আজও আছে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, পেয়েছে তার দৃঢ় ভিত্তি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। ক্রমসমৃদ্ধির যাত্রা তার আছে অব্যাহত। তাই, অযোধ্যা ঠিকই আছে, আছে সরযূও, নেই শুধু দশরথ, আর দাশরথি রাম। রামের বংশধর আছে, কিন্তু রাম তো নেই। রাম যখন ছিলেন, তখন ‘রাজসূয় যজ্ঞ’ও হতো ফি বছরে। আমরা তাকে ‘আনন্দ যজ্ঞ’ বলতাম। নাম ছিল তার ‘স্মৃতিবার্ষিকী’। অযোধ্যার (মনসুকা) রাম (ঈশ্বরচন্দ্র) এই আনন্দ যজ্ঞটি (স্মৃতিবার্ষিকী উৎসব) অতি নিষ্ঠাভরেই করতেন ও যজ্ঞশেষে পূর্ণাহুতি দিতেন, ঠিক যেমন পিতৃ-আদেশ পালন করেন রামচন্দ্র বা ভ্রাতৃ-আদেশ পালনে রত হন ভরত। আর এখানে এই কবিতীর্থেও আর এক রাম অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার মনের ইচ্ছার রূপ দিতে ‘শান্তিনিকেতন’ বানিয়ে গেলেন, প্রতি বছর পিতার দীক্ষান্ত দিনটিকে জনমনে জাগিয়ে রাখতে অদূরে কেঁদুলীর ‘জয়দেব মেলা’-এর আদলে ‘পৌষমেলা’-র সৃষ্টি করে গেলেন। শান্তিনিকেতন থেকে মনসুকা অনেক দূরের পথ, চারটি জেলার ব্যবধান। কিন্তু এ দুই জায়গার দুই রাম, অর্থাৎ স্রষ্টাদ্বয়ের সৃষ্টির আদর্শ যেন একই হারে, একই ভারে গ্রথিত হয়েছে। দু'জনেই নিজ নিজ সৃষ্টিকে রূপ দিতে গিয়ে নিজ নিজ সম্পত্তি, জমিদারী, ইত্যাদিকে উৎসর্গ করেছেন তাঁদের সৃষ্ট মানসকন্যাদ্বয়ের কল্যাণে—লালন-পালনে। অনেক প্রতিষ্ঠানের গোড়ার ইতিহাসও এই রকম অনেক মহাপ্রাণের নিঃস্বার্থ ত্যাগে, দানে ও সেবায় লেখা হয়েছে। আমার দ্বিতীয় তথা শেষ বিদ্যালয় জীবন কাটে ক্ষীরপাই বিদ্যালয়ে, তা আগেই বলেছি। সেটিরও প্রাথমিক গঠনকালের রূপকার ছিলেন অগ্রজ প্রয়াত বৈদ্যনাথ রায় মহাশয়। কী কষ্টেই না তিনি একদিন বিদ্যালয়টিকে চালাতে চেষ্টা পেয়েছেন সেদিন। লটারি পর্যন্ত করেছেন বারবার। হে ঈশ্বর, ওগো ভগবান! এমন মহাপ্রাণদের তুমি বেশি করে পাঠাও না কেন তোমার এই অভাগা মর্ত্যধামে? তাহলে তো অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারত। এবার সেই সে আনন্দযজ্ঞের কথায় আসি।
২) স্মৃতিবার্ষিকী উৎসব
সম্ভবতঃ পিতৃদেবের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী বা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী-দিবস হিসাবেই পালিত হতো দিনটি। ঠিক ইতিহাস জানা নেই। সে দিনটিতে দেখতাম, ‘ঈশ্বর’ যেন সত্যিই ঈশ্বর হয়েছেন। একইসঙ্গে কর্তব্যের টানে ধ্যানমগ্ন, অথচ সদাচঞ্চল। আবার যেন ব্রতধারীও। উৎসব শেষে সমূহ ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকমণ্ডলীর তার গৃহে অন্নগ্রহণের থাকত নিমন্ত্রণ—প্রাণের নিমন্ত্রণ। যতক্ষণ না সবার ভোজন-পর্ব নির্বিঘ্নে সমাধা হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি যেন "কোনো আলোকে মঙ্গলালোকে" থাকতেন ধ্যানমগ্ন, অচঞ্চল ও উদ্বিগ্নমনা। এই প্রাণপুরুষের পুরো কর্মপ্রণালীটাই যেন জীবনের এক বড় শিক্ষা। সেই ঋষিতুল্য মানুষটিকে আজ অন্তরের অযুত প্রণাম জানিয়ে যাই।
এই স্মৃতিবার্ষিকী উৎসব ছিল বহুদিকে বিস্তৃত—আবৃত্তি, নাটিকা, ক্রীড়া প্রদর্শন, সঙ্গীত, পুরস্কার বিতরণ, বক্তৃতা ও শেষে জমিদার বাড়িতে ভোজনপর্বানুষ্ঠান। ফুল, মালা, পতাকা নিয়ে দলে দলে আমরা হাজির হতাম ঐ মধুর স্মৃতি-দিয়ে ঘেরা দিনটিতে। সম্ভবতঃ গ্রীষ্মের এক তাপদগ্ধ দিনেই এই মহোৎসব হত। প্রায় এক/দেড়মাস আগে থেকেই চলত নানান বিষয়ের মহড়া। ইংরেজিতে আবৃত্তি করা ছিল আমার নির্ধারিত বিষয়। এ বিষয়ে আমার প্রথম নির্দেশক ছিলেন প্রয়াত রামপদ পোড়ে মহাশয় ও তৎসহ প্রয়াত মহেন্দ্রবাবু ও পার্বতীচরণ মণ্ডল মহোদয়দ্বয়—একথা আগেই বলেছি। পুরস্কারই যে কত পেতাম, তার লেখাজোখা নেই—উচ্চতর শ্রেণীতে উচ্চস্থান অধিকারে, আবৃত্তিতে, ইংরেজি হাতের লেখায়, পরীক্ষায় ইংরেজিতে বেশি নম্বর পাওয়ায়, ইত্যাদিতে। এমন একটি সুমধুর উৎসব ছাত্রছাত্রীদের জীবনে কী যে দারুণ প্রভাব বিস্তার করে, তা ভুক্তভোগীরা নিশ্চয়ই বোঝেন।
জীবন-সায়াহ্নে এসে জীবনদেবতা আমার কাছে তার ঋণশোধ করতে মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর সাধনার সুযোগ দেন। ১৯৯০ সাল। সেই প্রথম সেখানে বিদ্যাসাগরের মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠান পালনের সূচনা করলাম, ভাষণও দিলাম। সে ভাষণে বাল্যের, কৈশোরের এই স্মৃতিবার্ষিকীটির পুরো চিত্রটি তুলে ধরি ও সেই সঙ্গে বীরসিংহ বিদ্যালয়ের স্মৃতিবার্ষিকীর কথাও। ভাষণটি ১৯৯১ সালের ‘বন্দনা’ ও ‘তরুণবার্তায়’ প্রকাশ পেয়েছে।
৩) কথাশেষ
এতক্ষণ ধরে আমার সুধী পাঠক-পাঠিকার ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়েছি বলে আমার অনিচ্ছাকৃত অপরাধ স্বীকার করছি। তবে এর পেছনে আমার লক্ষ্য শুধু একটাই—তা হলো আমার অগণিত উত্তরসূরি ছাত্রছাত্রী আমার এ অতীত চারণায় হয়ত উপকৃত হবে, আগামীর আনন্দ সন্ধানে রত হবে। অনেকদিন ধরে তাদের মন রাঙিয়ে উঠতে থাকবে, গুনগুনিয়ে গান গেয়ে উঠবে তাদের মন, কণ্ঠ, কারণ এ যে তাদের নিজের জিনিস, মাটির জিনিস। আর সেইখানেই মোর জয়, আমার অনেক পাওয়া। আমি কবি নই, নই সাহিত্যিকও। অনাড়ী ও অপরিপক্ক হাতে কখনো-সখনো কিছু লেখার চর্চা করে থাকি মাত্র। এও হয়ত এই কবিতীর্থের পুণ্য মাটির দান, ঠিক জানিনে।
এবার কথা করি শেষ। শেষের বেলায় আমার বেলা শেষের গান গেয়ে যাই চলে—
হে নূতন, হে নবীন,
আত্মার আত্মীয়,
ওগো উত্তরসূরি!
তোমারে জানাই,
মোরা যেন চিরকাল,
সমস্বরে গান গেয়ে যাই:
“যাবার বেলায়
এই কথাটি
জানিয়ে যেন যাই,
যা পেয়েছি, যা নিয়েছি,
তুলনা তার নাই।”