মনসুকা খবর, শ্যামল রং, ৪ সেপ্টেম্বর: দেশজুড়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এক যুগান্তকারী ঘোষণা করল জিএসটি কাউন্সিল। ২০১৭ সালে জিএসটি চালু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় সংস্কারে সিলমোহর দিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের পৌরোহিত্যে কাউন্সিল ১২% এবং ২৮%-এর দুটি কর স্ল্যাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পরিবর্তে, দেশকে একটি সরলীকৃত দ্বি-স্তরীয় কর কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে মূল হার হবে ৫% এবং ১৮%। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং বিলাসবহুল পণ্যের উপর একটি নতুন ৪০% কর আরোপ করা হয়েছে। ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ থেকে কার্যকর হতে চলা এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনে গৃহস্থালির দৈনন্দিন খরচ থেকে শুরু করে গাড়ি, বাড়ির সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে চলেছে, যা উৎসবের মরসুমের আগে মধ্যবিত্তের জন্য এক বিরাট উপহার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বুধবার থেকে চলতে থাকা ৫৬তম জিএসটি কাউন্সিলের ম্যারাথন বৈঠকের পর আজ এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। এই সংস্কারের সবচেয়ে বড় এবং অপ্রত্যাশিত স্বস্তির খবরটি হলো স্বাস্থ্য এবং জীবন বিমার উপর থেকে জিএসটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার। এতদিন পর্যন্ত বিমার প্রিমিয়ামের উপর ১৮% কর দিতে হতো, যা এখন শূন্য হয়ে যাওয়ায় পলিসিগুলি সরাসরি সস্তা হবে এবং দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি, ক্যান্সারসহ ৩৩টি জীবনদায়ী ওষুধের উপর থেকে জিএসটি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্যখাতে সাধারণ মানুষের বোঝা অনেকটাই লাঘব করবে।
দৈনন্দিন জীবনের খরচেও এই পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এতদিন যে সমস্ত ভোগ্যপণ্য যেমন এয়ার কন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন ২৮% করের আওতায় ছিল, সেগুলি এখন ১৮% স্ল্যাবে চলে আসায় দাম কমবে। একইভাবে, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, সাবান এবং চুলের তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর কর ১৮% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে। ঘি, বাদাম, চিজের মতো খাদ্যদ্রব্যও এখন ১২%-এর পরিবর্তে ৫% জিএসটি দেবে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি অটোমোবাইল শিল্পেও নতুন গতির সঞ্চার করতে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকা ছোট গাড়ি (১২০০ সিসি পর্যন্ত পেট্রোল ও ১৫০০ সিসি পর্যন্ত ডিজেল) এবং ৩৫০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের উপর করের হার ২৮% থেকে কমিয়ে ১৮% করা হয়েছে। এর ফলে গাড়ি ও বাইকের দাম সরাসরি কমবে এবং বাজারে চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক গাড়ি যেমন বাস, ট্রাক এবং অটো পার্টসের উপরও কর কমিয়ে একটি অভিন্ন ১৮% হার চালু করা হয়েছে। তবে বিলাসবহুল জীবনযাপনে রাশ টানতে বড় এবং বিলাসবহুল গাড়ি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলকে নতুন ৪০% করের আওতায় আনা হয়েছে।
এই নতুন ৪০% 'ডিমেরিট' স্ল্যাবটি মূলত সরকারের রাজস্ব স্থিতিশীল রাখতে এবং ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করবে। পান মশলা, গুটখা, তামাকজাত দ্রব্য এবং চিনিযুক্ত পানীয়র মতো পণ্যগুলি এই উচ্চ করের আওতায় আসবে। তবে অনলাইন গেমিং, ক্যাসিনো এবং ঘোড়দৌড়ের মতো শিল্পের জন্য এই সিদ্ধান্ত একটি বড় ধাক্কা, কারণ তাদেরও ৪০% করের আওতায় আনা হয়েছে।
এই সংস্কার কেবল করের হারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শিল্পক্ষেত্রের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানেরও চেষ্টা করেছে। বস্ত্রশিল্প এবং সার শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে 'ইনভার্টেড ডিউটি স্ট্রাকচার'-এর সমস্যা দূর করতে কাঁচামালের উপর কর কমানো হয়েছে, যা 'মেক ইন ইন্ডিয়া' অভিযানকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়াও, জিএসটি সংক্রান্ত আইনি বিতর্কগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বহু প্রতীক্ষিত জিএসটি আপিলেট ট্রাইব্যুনাল এই বছরের শেষ থেকেই কাজ শুরু করবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপগুলি জিএসটি ব্যবস্থাকে আরও সরল, স্বচ্ছ এবং নাগরিক-বান্ধব করে তুলবে। যদিও পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং রিয়েল এস্টেট এখনও জিএসটি-র বাইরেই রয়ে গেল, তবে এই সংস্কারকে 'জিএসটি ২.০'-এর সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা ভারতীয় অর্থনীতিকে এক নতুন দিশা দেখানোর ক্ষমতা রাখে।
