জেমিনির ফটো ট্রেন্ড: ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা, নাকি অমূলক আতঙ্ক?

শ্যামল রং, মনসুকা খবর: সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে গুগলের নতুন এআই (AI) টুল জেমিনির ফটো এডিটিং বা ফটো জেনারেশন ফিচার। সাধারণ মানুষ নিজেদের ছবি আপলোড করে কৃত্রিম মেধার সাহায্যে তৈরি করছেন নিত্যনতুন আকর্ষণীয় ছবি। কিন্তু এই নতুন ট্রেন্ডকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। একাধিক বিশেষজ্ঞ, এমনকি পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, জেমিনিতে ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করার অর্থ হলো নিজের সমস্ত তথ্য গুগলের হাতে তুলে দেওয়া, যা ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হতে পারে। এই সতর্কবার্তাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলেছেন প্রযুক্তিবিদদের অন্য একটি অংশ। তাঁদের পাল্টা যুক্তি, এই আশঙ্কাটি অমূলক এবং একটি বৃহত্তর সত্যকে এড়িয়ে যাচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যেকোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, বিশেষত এআই টুলে, ব্যক্তিগত ছবি বা ডেটা আপলোড করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের আশঙ্কা, এই ছবিগুলো গুগলের সার্ভারে সংরক্ষিত থাকছে এবং বিজ্ঞাপন, ডেটা অ্যানালিসিস বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এমনকি সার্ভার হ্যাক হলে সেই তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, "মানুষকে ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে আরও সচেতন হতে হবে। কোনো অ্যাপ ব্যবহারের আগে তার শর্তাবলি (Terms and Conditions) ভালোভাবে পড়ে নেওয়া উচিত।"

তবে এই যুক্তিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন অনেক প্রযুক্তিপ্রেমী এবং বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, আজকের দিনে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের প্রায় প্রত্যেকের ফোনেই রয়েছে গুগল ফটোস (Google Photos)। ফোনের গ্যালারিতে থাকা সমস্ত ছবি ও ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগল ফটোসে ব্যাকআপ হিসেবে জমা হয়। অর্থাৎ, একজন অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত মাল্টিমিডিয়া ফাইলগুলো বহু দিন ধরেই গুগলের সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে। গুগল চাইলে সেই তথ্যে আগে থেকেই অ্যাক্সেস করতে পারে।

এই অংশের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, যে ছবিটি আপনি জেমিনিতে ব্যবহার করছেন, সেটি যদি আপনার গুগল ফটোসে আগে থেকেই থেকে থাকে, তাহলে নতুন করে তথ্য ফাঁসের ভয় অবান্তর। কারণ গুগল সেই ছবিটি জেমিনির মাধ্যমে নতুন করে অ্যাক্সেস করছে না; বরং নিজেরই এক পরিষেবা থেকে অন্য পরিষেবাতে ডেটা ব্যবহার করছে মাত্র। এটি অনেকটা গুগলের এক পকেট থেকে অন্য পকেটে তথ্য স্থানান্তরের মতো। তাই শুধুমাত্র জেমিনি ব্যবহারের জন্য নতুন করে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে—এই ভাবনাটি ভিত্তিহীন।

তবে এই বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তাঁদের মতে, গুগল জেমিনি ব্যবহার করাটা হয়তো নিরাপদ, কিন্তু এর থেকে তৈরি হওয়া অভ্যাসটি বিপজ্জনক হতে পারে। জেমিনির মতো ফিচার ব্যবহার করে মানুষ সহজেই যেকোনো এআই টুলে ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

ভবিষ্যতে যদি গুগল বা অন্য কোনো বিশ্বস্ত কোম্পানির বদলে কোনো অখ্যাত বা সন্দেহজনক থার্ড-পার্টি অ্যাপ একই ধরনের আকর্ষণীয় ফিচার নিয়ে আসে, তখন ব্যবহারকারীরা অভ্যাসের বশে সেখানেও নিজেদের ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করে ফেলতে পারেন। সেই থার্ড-পার্টি অ্যাপগুলোর ডেটা সুরক্ষা নীতি দুর্বল হতে পারে এবং সেখান থেকেই ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি বা অপব্যবহারের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ছবি বিকৃত করে ডিপফেক (Deepfake) তৈরি বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের ঝুঁকিও তখন বহু গুণ বেড়ে যাবে।


সুতরাং, মূল বিতর্কটি গুগল জেমিনিকে নিয়ে নয়, বরং ব্যবহারকারীর ডিজিটাল সচেতনতা নিয়ে। কোনো বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম এবং একটি অসুরক্ষিত থার্ড-পার্টি অ্যাপের মধ্যে পার্থক্য করার অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রযুক্তি ব্যবহার করুন, কিন্তু ভেবেচিন্তে। যেকোনো নতুন ট্রেন্ডে গা ভাসানোর আগে তার পেছনের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে অবগত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।

Shyamal Kumar Rong

আমি মনসুকা খবরের এডিটর। মনসুকা খবরে আপনি যেকোনো খবর, ভিডিও, তথ্য বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আপনার তথ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫৭৩২৫২৫

Previous Post Next Post
Mansuka Khabar

বিজ্ঞাপন

Mansuka Khabar