মনসুকা খবর, নিউজ ডেক্স: সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা, গ্রেপ্তার এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় উত্তরপ্রদেশের কানপুর শহরে। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে স্থানীয় মুসলিম যুবকরা ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা একটি আলোকসজ্জিত বোর্ড স্থাপন করেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী এতে আপত্তি জানায় এবং এটিকে একটি ‘নতুন প্রথা’ চালু করার প্রচেষ্টা বলে অভিযোগ করে। তাদের আপত্তির মুখে পুলিশ ওই বোর্ডটি সরিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অভিযোগে নয়জন নাম সহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করে।
কানপুর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র ব্যানার লাগানোর জন্য মামলা করা হয়নি। তাদের অভিযোগ, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং অন্য গোষ্ঠীর ধর্মীয় পোস্টার ছেঁড়ার মতো ঘটনাও ঘটে। পুলিশি পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে "নতুন প্রথা" চালু করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে।
কানপুরের এই ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশের উন্নাও, পিলভিট, বরেলী এবং গুজরাটের গোধরার মতো বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক জায়গায় মুসলিম যুবকদের মিছিল করতে বাধা দেওয়া হয়েছে, তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোধরায় একটি রিল ভিডিও বানানোর জন্য এক মুসলিম যুবককে থানায় ডেকে মারধরের অভিযোগও উঠেছে।
এই ধারাবাহিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাদের মতে, নিজেদের ধর্মীয় নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা কোনো অপরাধ হতে পারে না এবং এটি তাদের সাংবিধানিক ও ধর্মীয় অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এই ঘটনার প্রতিবাদে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র সহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তাদের দাবি, পুলিশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলিমদের নিশানা করছে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলা দায়ের করছে।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, "নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা কবে থেকে অপরাধ হলো?" তিনি পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন যে, এটি একপেশে পদক্ষেপ এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এই ধরনের ব্যানারকে উস্কানিমূলক বলে মনে করছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় নতুন এবং অপ্রচলিত প্রথা যোগ করে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কটি ভারতের ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণের প্রতিফলন। একটি সাধারণ ধর্মীয় স্লোগানকে কেন্দ্র করে যেভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে এবং প্রশাসন যেভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তাদের মতে, "আইনশৃঙ্খলা" রক্ষার নামে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশকে দমন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ একটি ভালোবাসার প্রকাশকে ঘিরে এই বিতর্ক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামো এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে এক নতুন পরীক্ষার সূচনা করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই এখন সকলের নজর।
