ঘাটাল মহকুমায় বাড়ছে নদীর জল, শিলাবতী বিপদসীমার দোরগোড়ায়, বন্যার আশঙ্কা

শ্যামল রং, ঘাটাল, ৫ই অক্টোবর, ২০২৫: একটানা বৃষ্টি এবং উচ্চ অববাহিকা থেকে আসা জলের চাপে ঘাটাল মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সেচ দপ্তরের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, শিলাবতী নদীর জলস্তর বিপদসীমার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। রূপনারায়ণ এবং পুরাতন কংসাবতী নদীর জলস্তরও ক্রমশ বাড়ছে, যা নিয়ে ঘাটাল এবং সংলগ্ন এলাকার নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

আজ, অর্থাৎ ০৫/১০/২০২৫ তারিখে সেচ দপ্তরের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, বাঁকা ঘাটে শিলাবতী নদীর জলস্তর সকাল ৫টায় ১৪.৯৫ মিটারে পৌঁছে যায়, যা বিপদসীমার (১৫.০৮ মিটার) থেকে মাত্র ০.১৩ মিটার বা প্রায় ৫ ইঞ্চি নিচে। যদিও দিনের বেলায় জলস্তর কিছুটা কমে ১৩.৬৫ মিটারে নেমে আসে, কিন্তু এই সামান্য হ্রাস স্থানীয়দের উদ্বেগ কমাতে পারেনি।

অন্যদিকে, রূপনারায়ণ নদের রানিচক পয়েন্টে জলস্তর ক্রমাগত বেড়ে রাতের ১১টায় ৫.৩০ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপদসীমার (৫.৯৪ মিটার) দিকে এগোচ্ছে। একইভাবে, কালমিজোড়ে পুরাতন কংসাবতী নদীর জলস্তর বেড়ে ৭.৪৫ মিটারে দাঁড়িয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৪ ঘন্টায় ঘাটালে ১৭.২০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং এই মরসুমে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৩৭.২০ মিমি। এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি মাটিকে জল শোষণ করার ক্ষমতার বাইরে নিয়ে গেছে, ফলে সমস্ত জল সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে এবং জলস্তর দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে।


ঘাটাল মহকুমার বন্যাপ্রবণ ব্লকগুলির বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন। নিচু এলাকাগুলিতে জল জমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চাষের জমি ডুবে গেলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে ঘাটাল মহাকুমার বিভিন্ন স্থান জল মগ্ন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে বলে জানা গেছে। সেচ দপ্তর প্রতি ঘন্টায় নদীর জলস্তরের উপর কড়া নজর রাখছে এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন আরও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গল্পের সেই ছোট্ট ডাচ বালক হ্যান্সের কথা মনে আছে? যে সারারাত বাঁধের ছোট্ট গর্তে হাতের মুঠো ঢুকিয়ে রেখে গ্রামকে ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সেই কিংবদন্তীরই যেন বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমায়। এখানে কোনো একটি শিশু নয়, সেচ ও জলপথ বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক এবং ঠিকাদার সংস্থার কর্মচারীরাই আধুনিক হ্যান্সের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ফুঁসতে থাকা শিলাবতী, ঝুমি ও রূপনারায়ণের রোষ থেকে বিস্তীর্ণ এলাকাকে রক্ষা করতে রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন তাঁরা।
চলতি মরসুমে এই নিয়ে আবার বন্যার কবলে পড়েছে ঘাটাল। একটানা ভারী বর্ষণ এবং ডিভিসি-র ছাড়া জলে নদীগুলি কানায় কানায় পূর্ণ। ইতিমধ্যেই ঘাটাল পুরসভার নিচু এলাকা এবং দাসপুর, চন্দ্রকোণার বহু গ্রাম জলমগ্ন। জলের তলায় বিঘার পর বিঘা চাষের জমি। এমন পরিস্থিতিতে সবথেকে বড় আতঙ্ক—নদীর বাঁধ। কোথাও সামান্যতম ফাটল বা ধস দেখা দিলেই তা সর্বগ্রাসী বন্যার রূপ নিতে পারে।
এই আশঙ্কার বিরুদ্ধেই প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন সেচ দপ্তরের কর্মীরা।  কোথাও টর্চের আলো ফেলে বাঁধের অবস্থা খতিয়ে দেখছেন ইঞ্জিনিয়াররা, কোথাও আবার শ্রমিকরা বালির বস্তা ফেলে দুর্বল অংশকে মজবুত করার চেষ্টা করছেন। রাত যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীর জলস্তর, আর তার সাথে বাড়ছে এদের কাজের গতি ও উদ্বেগ।


যেখানে সাধারণ মানুষ ঘরের ভিতরে থাকতেই আতঙ্কিত, সেখানে এই কর্মীরা খোলা আকাশের নিচে, সাপের ভয় এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র কর্তব্যের টানে বাঁধ আগলে রেখেছেন। তাঁদের এই নীরব সংগ্রাম হয়তো অনেকেরই অজানা, কিন্তু তাঁদের এই রাত জাগা লড়াইয়ের জন্যই ঘাটাল মহকুমার হাজার হাজার পরিবার আজ সুরক্ষিত। গল্পের হ্যান্স একা একটি গ্রামকে বাঁচিয়েছিল, আর এখানে এই অগণিত 'হ্যান্স'-রা একটি গোটা মহকুমাকে বাঁচানোর নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।


Shyamal Kumar Rong

আমি মনসুকা খবরের এডিটর। মনসুকা খবরে আপনি যেকোনো খবর, ভিডিও, তথ্য বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আপনার তথ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫৭৩২৫২৫

Previous Post Next Post
Mansuka Khabar

বিজ্ঞাপন

Mansuka Khabar