শ্যামল রং, ৯ই অক্টোবর, ২০২৫: রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ধান চাষিরা গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছেন। আমন ধানের জমিতে বাদামী শোষক পোকার (Brown Plant Hopper) ব্যাপক আক্রমণ দেখা দিয়েছে, যা নিয়ে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। মেঘলা আবহাওয়া এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এই পোকার সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কৃষি দপ্তর। এই পরিস্থিতিতে ফসলের বড়সড় ক্ষতি এড়াতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগ (শস্য সুরক্ষা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণ) এক জরুরি সতর্কতা এবং নির্দেশিকা জারি করেছে।
বাদামী শোষক পোকা, যা স্থানীয়ভাবে অনেক চাষি 'কারেন্ট পোকা' বা 'ভ্যানভ্যানে' পোকা নামেও চেনেন, ধানের অন্যতম প্রধান শত্রু। এই পোকাগুলি ধান গাছের গোড়ায় বসে রস চুষে খায়, যার ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। আক্রমণের তীব্রতা বাড়লে গাছগুলি হলুদ হয়ে শুকিয়ে যেতে শুরু করে, যা 'হপার বার্ন' (Hopper Burn) নামে পরিচিত। এর ফলে পুরো খেতটি পুড়ে যাওয়ার মতো দেখতে লাগে এবং সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বর্তমান মেঘলা ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া এই পোকার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল। পাশাপাশি, যে সমস্ত চাষি জমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন-যুক্ত সার (যেমন ইউরিয়া) প্রয়োগ করেছেন, তাঁদের জমিতে এই পোকার আক্রমণের ঝুঁকি আরও বেশি। আর্দ্র পরিবেশে এরা দ্রুত ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করে, যা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ফসলের ক্ষতি রুখতে কৃষি দপ্তর একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছে। এই নির্দেশিকা প্রতিটি ব্লকের কৃষি আধিকারিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে যাতে মাইকিং এবং অন্যান্য মাধ্যমে দ্রুত চাষিদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
চাষিদের প্রতিদিন নিজেদের জমি পরিদর্শন করতে এবং বিশেষ করে ধান গাছের গোড়ার অংশ ভালো করে পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতি ধান গাছের গোছায় ৪-৫টি বাদামী শোষক পোকা দেখা গেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে, নচেৎ ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পোকার আক্রমণের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করতে প্রথমেই জমি থেকে জমে থাকা জল বের করে দিতে হবে। অন্তত ১-২ দিন জমি শুকনো রাখলে পোকার বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং কীটনাশক প্রয়োগের কার্যকারিতা বাড়বে।
কীটনাশক শুধুমাত্র গাছের পাতায় স্প্রে করলে চলবে না। যেহেতু এই পোকা গাছের গোড়ায় থাকে, তাই স্প্রে করার সময় কীটনাশক যাতে গাছের গোড়ায় পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
টার্গেটেড স্প্রে পদ্ধতি: ঘন ধানক্ষেতের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দুজন মিলে একটি দড়ি দিয়ে ধান গাছ সরিয়ে ধরলে তৃতীয় একজন সেই ফাঁকা জায়গায় গাছের গোড়ায় সরাসরি কীটনাশক স্প্রে করবেন। এতে কীটনাশকের অপচয় কম হবে এবং তা সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে।
কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে বেশ কিছু অনুমোদিত কীটনাশকের নাম ও তাদের প্রয়োগের মাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:
পাইমেট্রোজিন ৫০% ডব্লিউজি (Pymetrozine 50% WG), ট্রাইফ্লুমেজোপাইরিম ১০% এসসি (Triflumezopyrim 10% SC), ডাইনোটেফুরান ২০% এসজি (Dinotefuran 20% SG), থায়ামেথোক্সাম ২৫% ডব্লিউজি (Thiamethoxam 25% WG), ফ্লুপাইরিমিন ২% জিআর (Flupyrimin 2% GR)
চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেকোনো অনুমোদিত কীটনাশক বিক্রেতা বা স্থানীয় কৃষি আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলে সঠিক কীটনাশক ও তার মাত্রা সম্পর্কে জেনে নিতে।
